[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জিলহজ মাস: রহমত, ত্যাগ ও নেক আমলের সোনালি দিনগুলোর ফজিলত ও করণীয়

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬ ৫:৩৬ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ইসলামের বারো মাসের মাঝে জিলহজ মাস এক অনন্য নেয়ামত ও বরকতময় সময়, যা আমাদের হজের পবিত্রতা, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মাসের প্রথম দশ দিন এতটাই ফজিলতপূর্ণ যে

 আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর শপথ করে ইরশাদ করেছেন, (وَالْفَجْرِ ۝ وَلَیَالٍ عَشْرٍ) অর্থাৎ "শপথ ফজরের এবং শপথ দশ রাতের।" (সুরা আল-ফজর: ১-২)। মুফাসসিরগণের মতে, এখানে 'দশ রাত' বলতে জিলহজের প্রথম দশ রাতকে বোঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোর গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছেন, (مَا مِنْ أَیَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَیَّامِ) অর্থাৎ "এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।" (বুখারি ৯৬৯)। একজন মুমিনের জন্য এই দিনগুলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও নেক আমলের এক সুবর্ণ সুযোগ।

​জিলহজ মাসের অন্যতম প্রধান আমল হলো তওবা ও ইস্তিগফার করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, (وَاسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودٌ) "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে আসো। নিশ্চয়ই আমার রব অতি দয়ালু ও পরম স্নেহশীল।" (সুরা হুদ: ৯০)। এই পবিত্র সময়ে অতীতের সব গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

​এই দিনগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা। হজরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো ছাড়তেন না— আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম নয় দিনের রোজা, প্রতি মাসের তিন দিনের রোজা এবং ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ। বিশেষত ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনের রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, যা দুই বছরের গুনাহ মাফের কারণ হয়। এই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ) "আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।" (মুসলিম ১১৬২)।

​যারা আসন্ন ঈদে কুরবানি করার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, (إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا) "যখন জিলহজের দশক শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও শরীরের কোনো অংশ না কাটে।" (মুসলিম ১৯৭৭)।

​জিলহজের এই দিনগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা উচিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, (وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ) "এবং তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করবে।" (সুরা আল-হজ: ২৮)। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ) "তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল (লা ইলাহা ইলাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ কর।" (মুসনাদে আহমাদ ৫৪৪৬)।

​ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি এই সময়ে নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া আবশ্যক। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, (وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ) "আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একসময় আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।" (বুখারি ৬৫০২)। তাই নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য খোঁজা উচিত।

​জিলহজ মাসের একটি অন্যতম ওয়াজিব আমল হলো তাকবিরে তাশরিক আদায় করা। ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর (اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ) "আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ" পড়া প্রত্যেক মুসল্লির ওপর আবশ্যক।

​দোয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ায় এই বরকতময় সময়ে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত, কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, (ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ) "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সুরা গাফির: ৬০)। এছাড়া সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ পালন করা জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (الْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْসَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ) "মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।" (বুখারি ১৭৭৩)।

​কুরবানির দিনগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّমِ) "কুরবানির দিনে পশু জবাই করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।" (তিরমিজি ১৪৯৩)। একই সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ) "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ৫৯৮৪)।

​পরিশেষে, এই মহিমান্বিত দিনগুলোতে সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, (وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ) "তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব গুনাহ বর্জন কর।" (সুরা আল-আনআম: ১২০)। জিলহজ মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বোচ্চ লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিলহজের মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথ আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

এসআর

সম্পর্কিত খবর