পবিত্র কোরআনের ‘সুরা ইউসুফ’-এ বর্ণিত নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনকাহিনি কেবল একটি
অলৌকিক ইতিহাস নয়, বরং এটি ধৈর্য, নৈতিকতা এবং আল্লাহর অমোঘ পরিকল্পনার এক জীবন্ত দলিল। একজন কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া দাস থেকে সময়ের আবর্তে তার মিসরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠার ঘটনাটি আজও বিশ্ববাসীর জন্য পরম শিক্ষণীয়।
শৈশবের স্বপ্ন ও ভ্রাতৃ-ঈর্ষার শিকার
ইউসুফ (আ.) শৈশবে স্বপ্নে দেখেছিলেন সূর্য, চাঁদ ও ১১টি নক্ষত্র তাকে সিজদা করছে—যা ছিল তার ভবিষ্যৎ শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত। কিন্তু ভাইদের চরম ঈর্ষার কারণে তাকে কূপে নিক্ষিপ্ত হতে হয়। সেখান থেকে এক কাফেলার হাতে পড়ে তিনি মিসরে দাসে পরিণত হন এবং রাজপ্রাসাদে ঠাঁই পান।
কারাগার ও চারিত্রিক অগ্নিপরীক্ষা
মিসরের আজিজের ঘরে বড় হওয়ার সময় তিনি রূপ ও গুণের আধার হয়ে ওঠেন। তবে চারিত্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অপরাধে অর্থাৎ আজিজের স্ত্রীর অন্যায় আবদার প্রত্যাখ্যান করায় তাকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও তিনি আল্লাহর দাওয়াত ও চারিত্রিক দৃঢ়তা বজায় রাখেন।
বাদশাহর স্বপ্ন ও সংকট মোচনের পরিকল্পনা
ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের মোড় ঘুরে যায় মিসরের বাদশাহর একটি স্বপ্নকে কেন্দ্র করে। বাদশাহ দেখেন, সাতটি শুকনো গরু সাতটি পুষ্ট গরুকে খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও সাতটি শুকনো শীষ। রাজদরবারের বড় বড় পণ্ডিতরা যখন এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তখন কারাগারে থাকা ইউসুফ (আ.)-এর প্রজ্ঞার কথা সামনে আসে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, মিসরে টানা সাত বছর প্রাচুর্যের পর ভয়াবহ সাত বছরের দুর্ভিক্ষ আসবে। তিনি কেবল স্বপ্নের ব্যাখ্যাই দেননি, বরং আসন্ন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার জন্য ফসল সংরক্ষণ ও সঠিক বণ্টনের এক বাস্তবমুখী প্রশাসনিক পরিকল্পনাও পেশ করেন।
রাজক্ষমতা ও রাজত্ব লাভ
ইউসুফ (আ.)-এর প্রজ্ঞা, সত্যবাদিতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ তাকে সসম্মানে কারাগার থেকে মুক্ত করেন। নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা প্রমাণের পর বাদশাহ তাকে মিসরের কোষাগার ও অর্থব্যবস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। কোরআনের বর্ণনায়, বাদশাহ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে ক্ষমতাবান ও বিশ্বাসযোগ্য।"
এভাবেই মহান আল্লাহর অসীম কুদরত ও পরিকল্পনায় একজন বন্দি থেকে তিনি মিসরের রাজত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করেন।
মূল শিক্ষা
ইউসুফ (আ.)-এর এই জীবনগাঁথা আমাদের শেখায় যে, সংকটে ধৈর্য ধরলে এবং সত্যের পথে অবিচল থাকলে আল্লাহ সম্মান ও সফলতা দান করেন। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময়ই চূড়ান্ত ও কল্যাণকর।
এসআর
মন্তব্য করুন: