এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নোটিশের জবাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো তা যাচাই করবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত ও পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংকট ও দুর্বল ফলাফলে থাকা অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ না করে কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী, যা আগের বছরের তুলনায় ২৯ হাজার ১৩ জন কম। একই সঙ্গে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এ বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি, গত বছর যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এবার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশে শিক্ষার্থী সংকট রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেই। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। এসব কলেজের কোনো কোনোটি থেকে মাত্র পাঁচ থেকে দশজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কিছু এলাকায় প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের একটি অংশ ভবিষ্যতে এমপিও সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় প্রতিষ্ঠান চালু করেন। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ না থাকায় শিক্ষার্থী ভর্তি ও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। বিপরীতে কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক।
প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম জানান, অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনিয়মিত। তাদের অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কারখানা ও দোকানে কাজ করেন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায় ফলাফলেও এর প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে নেত্রকোনার ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজ টানা দুই বছর শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করেননি। আগের বছর দুই পরীক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু জানান, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। সেখানে স্থায়ী বা নিয়মিত শিক্ষক নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক ডেকে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধাও প্রতিষ্ঠানটি পায় না।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ এবং সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজও এবার শূন্য পাস করেছে। ফকিরহাট মহিলা কলেজ থেকে দুজন এবং জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ফকিরহাট মহিলা কলেজে টানা তিন বছর ধরে কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারছেন না।
কলেজটির অধ্যক্ষ মাহবুবার রহমান রশিদ বলেন, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি শুধু পাঠদানের অনুমোদন পেয়েছে। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করায় অনেক শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে বন্ধ না করে আশপাশের ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কলেজগুলো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের চাকরি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ না করে কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা যায়, তা নিয়ে সরকার কাজ করছে। শূন্য পাস করা কলেজগুলোকে নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের চাকরি বহাল রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানান, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি গত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থী সংখ্যা, পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষকসংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে বলা হবে। এসব তথ্য যাচাই করে একাধিকবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পরপর দুই বা তার বেশি বছর কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়নি—এমন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা বাতিলের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নতুন করে এমপিও দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীও জানিয়েছেন, শুধু শূন্য পাস নয়, যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার অত্যন্ত কম, সেগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এফ/ডি