[email protected] শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
১৬ কার্তিক ১৪৩৩

তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে নতুন তথ্য, দীপকে নৌ পুলিশের কাছে দিল পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১:৩৪ এএম

সংগৃহীত ছবি

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ জুনিয়র বন্ধু হিসেবে পরিচিত দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা ছিলেন দীপ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই।

 

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় যায় তদন্ত দল। সেখানে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা এবং তার দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের পর তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মধ্যরাতে পিবিআইয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের ওই বাসার তৃতীয় তলা থেকে বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।

 

ঘটনাস্থলে নিয়ে তথ্য যাচাই, উদ্ধার মোটরসাইকেল

শুক্রবার দীপকে নিয়ে তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় তদন্ত চালায় পিবিআই। বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারসংলগ্ন মাঠে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

দীপের দেওয়া তথ্য অনুসারে ওই এলাকা থেকে কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটিতে কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না। এটি তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারীদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল। তাদের দেখে তাহসিফ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে পরে সেখান থেকে চলে যান।

 

তবে ধাওয়াকারীরা পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।

 

পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান সাংবাদিকদের জানান, দীপের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। ওই স্থানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন কি না, তাদের পরনে ইউনিফর্ম ছিল কি না কিংবা সেখানে তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল কি না, সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে।

 

দীপের বক্তব্যে অসংগতি, চলছে ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপের বক্তব্যে কয়েকটি অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। তারা কেন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, তা নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে সেখানে যাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। পরে মোটরসাইকেল সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, তাহসিফ তাকে সেটিতে করে ওই স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। এলাকাটি আগে থেকে তার পরিচিত ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

 

ঘটনার সময় তাদের সঙ্গে অন্য কেউ, এমনকি কোনো নারী ছিলেন কি না, সে বিষয়েও এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

এদিকে তাহসিফের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পিবিআইয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীপের সঙ্গে তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল।

 

মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে মোটরসাইকেল

শুক্রবার সকালে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় তুরাগ নদসংলগ্ন একটি মাঠ থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের জায়গা থেকে মোটরসাইকেলটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।

 

দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এর মালিকানা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নথি ও যন্ত্রাংশের নম্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

 

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর মূল তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনায় পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ও আলামত সংগ্রহ করে যাচাই করেছে। এসব তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

 

যেভাবে নিখোঁজ হন সাবেক এই বিমান কর্মকর্তা

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীপের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যেই তিনি বাসা ছেড়েছিলেন।

 

এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে দেখা যায়। সেখানে তারা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে চলে যান।

 

পরিবারকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় তারা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মেরামত শেষে একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি ফিরে যান। তবে পরবর্তী তদন্তে তাদের রাতের চলাফেরা ও যোগাযোগের বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, রাতের কোনো একসময় তারা টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছান।

 

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে দেখার খবর পেয়ে নদী পুলিশের সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে সেটি উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে পাওয়া আইফোনের মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ পরিবারের, অপেক্ষা পরীক্ষার প্রতিবেদনের

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না। দীপের দেওয়া নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বক্তব্যও তিনি বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না। তার দাবি, তাহসিফ সাঁতার জানতেন। পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের সময়ও তিনি সাঁতার শিখেছিলেন। তাই ছেলের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পেছনের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

এফ/ডি

সম্পর্কিত খবর