[email protected] সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩

জাপান সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতায় জোর দেবেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৮:০৬ পিএম

সংগৃহীত ছবি

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।


সফরকালে বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শনের পাশাপাশি ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।


গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ইপিএ বাস্তবায়ন ও বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব
আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর করা। পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হবে।


এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।


শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন
সফরের অংশ হিসেবে চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া নাগোয়ায় ইউনিক্লোর সদর দপ্তর ও টয়োটার কারখানা ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছে।


বর্তমানে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও পৃথক চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে।


বাংলাদেশে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে।


১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর কয়েকটি উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিআইজি-বি)’ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।


প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে পরিবহন ও নগর সংযোগ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়িকেন্দ্রিক শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোয় ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদনশিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও গাড়ি নির্মাণ খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।


এ ছাড়া জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায়
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই দেশের মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।


জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গত এপ্রিলে অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। ওই আলোচনায় এশিয়ার জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বে নেওয়া একটি উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন জানানো হয়েছিল। এবারের সফরকে সেই আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।


এ ছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।


১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা রয়েছে। এবারের সফরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতাকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর