দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে বছরব্যাপী জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
রোববার (১১ অক্টোবর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রচারের জন্য জারি গান, সারি গান, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি মানুষের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিবার পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। দীর্ঘদিন ২ দশমিক ৩-এ স্থির থাকার পর মোট প্রজনন হার বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। একই সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে।
একসময় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে একজন নারীর জীবদ্দশায় গড়ে সন্তান জন্মদানের সংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৩। ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলে ২০১২ সালে তা কমে ২ দশমিক ৩-এ আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অগ্রগতির গতি কমেছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি অনুমোদন না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে এ খাতের কার্যক্রমে পরিবর্তনের কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের সরবরাহ ব্যবস্থায়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মীরা কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, আইইউডি, ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্টসহ বিভিন্ন ধরনের গর্ভনিরোধক সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কেনাকাটা ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের বিভিন্ন উপজেলায় এসব উপকরণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ১৯৮টি উপজেলায় কনডমের মজুত শেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া ৩৫৪টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং ৪২৮টি উপজেলায় আইইউডি পাওয়া যাচ্ছিল না।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিনাত রেহানা জানান, গত দুই বছরে গর্ভনিরোধক সামগ্রী সরবরাহ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ ও সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও দুর্বল হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অসমাপ্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংগ্রহের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ এসব উপকরণ সংগ্রহ করে মাঠপর্যায়ে বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রী সরবরাহ শুরু হলে কোথায় এবং কীভাবে সেগুলো পাওয়া যাবে, তা সাধারণ মানুষকে জানানোও নতুন প্রচারাভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, মাঠপর্যায়ে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মীর অভাব একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় ৩৭ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কর্মী কম থাকায় পরিবার কল্যাণ সহকারীদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ছে।
ফলে প্রতিটি বাড়িতে নিয়মিত বিরতিতে গিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। জনবল সংকটের মধ্যেও বিদ্যমান কর্মীদের মাধ্যমে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
করোনাকালে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ব্যাঘাত এবং বাল্যবিবাহের প্রবণতাকেও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমানো এবং পরবর্তী সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ বিরতি সম্পর্কে পরিবারগুলোকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম মনে করেন, দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, যেসব নারী অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, যারা প্রয়োজন অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিতে পারছেন না এবং যেসব এলাকায় সেবাদাতা ও জনবলের সংকট রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর মতে, শহরাঞ্চলের দ্রুত বর্ধনশীল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার চাহিদাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু প্রচার চালিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়; সেবাপ্রাপ্তির সুযোগও বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক মাইনুল ইসলাম আরও জানান, পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা বা ‘আনমেট নিড’ বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ চাহিদা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণে জাতীয় কৌশল অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করা গেলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে আবারও গতি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসআর