ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে যাচ্ছে।
১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটের বড় অংশই নির্মাণ করা হবে মাটির নিচ দিয়ে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, আগামী বুধবার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় একনেক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন এমআরটি-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির যাচাই-বাছাই শেষ করে একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) একাধিক সভা ও পর্যালোচনার পর এর ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে সাত বছর, যা ২০৩৩ সালের আগস্টে শেষ হওয়ার কথা। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা কমিশন ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা করা হয়।
প্রস্তাবিত রুটটি রাজধানীর গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে।
পুরো রুটে ১৫টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ১১টি স্টেশন হবে ভূগর্ভস্থ এবং চারটি উড়ালপথে।
গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশটি ভূগর্ভস্থ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ হবে উড়ালপথে।
প্রাথমিকভাবে এই রুটে ১৯টি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ।
একটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। এর মধ্যে মাঝের চারটি কোচে ৩২৩ জন করে এবং দুই প্রান্তের কোচে ৩০৮ জন করে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে আনুমানিক ২৮ মিনিট সময় লাগবে। ট্রেন চলাচলের সম্ভাব্য ব্যবধান নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে দক্ষিণাঞ্চলীয় এই রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে ছয় কোচের ১৯ সেট মেট্রোরেল দিয়ে সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
২০৪০ সাল থেকে ছয় কোচের পরিবর্তে আট কোচের ট্রেন চালুর পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। তখন প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পের হিসাবে, শুরুতে একমুখী পথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার ১০৭ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। ২০৬০ সালে এই সক্ষমতা বেড়ে ঘণ্টায় ৩৮ হাজার ২৫৫ জনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় হবে মেইন লাইন ও স্টেশন নির্মাণ এবং ডিপোর সিভিল ও বিল্ডিং ওয়ার্কে।
এ খাতে ১৭ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই অ্যান্ড এম) এবং রেলওয়ে সিস্টেমের জন্য ১৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা এবং ট্রেন কোচ ও ডিপোর যন্ত্রপাতি কেনায় ৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ৪ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা, পরামর্শক সেবায় ১ হাজার ৬২৬ কোটি ৩১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তরে ৯৩০ কোটি টাকা এবং পরিবহন ভাড়ায় ৩০ কোটি ৭৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত ভৌত ব্যয়ের জন্য ৩৫৮ কোটি টাকা এবং মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় হিসেবে ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
ডিএমটিসিএলের হিসাবে, এমআরটি-৫ দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট চালু হলে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
এতে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি যানজট, জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফলের হিসাবে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল চালুর পর বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে।
একই সময়ে প্রায় ৪১ হাজার ২২০ টন জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানবাহনের চলাচলের দূরত্ব প্রায় ৬ লাখ ৪২ হাজার কিলোমিটার কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশ নির্মিত হলে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম করিডোরের মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে।
পাশাপাশি এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দান রুট ও এমআরটি লাইন-১-এর সঙ্গে আন্তঃসংযোগ তৈরি হলে যাত্রীরা বিভিন্ন মেট্রোরেল রুটে তুলনামূলক কম সময়ে যাতায়াত করতে পারবেন।
পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট ও দূষণ কমানো এবং নগরবাসীর যাতায়াতের সময় সাশ্রয় করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। সংশোধিত স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এসআর