অ্যালকোহল পান না করলেও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গভীর রাতে খাবার খাওয়া,
প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা কিংবা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করার মতো বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে খুব একটা ক্ষতিকর মনে হয় না। তবে এই অভ্যাসগুলো যখন দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শরীরের শর্করা নিয়ন্ত্রণ, চর্বি জমা এবং ইনসুলিনের কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে।
অ্যালকোহল পান করেন না এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভার দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে তা প্রদাহ, লিভারে ক্ষত কিংবা সিরোসিসের মতো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। লিভার সুরক্ষায় দৈনন্দিন জীবনের এমন পাঁচটি ক্ষতিকর অভ্যাসের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন:
১. দেরিতে খাবার খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই ঘুমানো
রাতে দেরিতে খাবার খাওয়া মানেই যে সবসময় ক্ষতি, তা নয়। তবে নিয়মিত ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খেলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, সেই সঙ্গে ঘনঘন স্ন্যাকস খাওয়া বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে। এই অভ্যাসগুলো বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে অতিরিক্ত খাবার, চিনিযুক্ত ডেজার্ট এবং প্রক্রিয়াজাত শর্করা শরীরে অতিরিক্ত শক্তির জোগান দেয়, যা লিভারে চর্বি জমার অন্যতম কারণ।
করণীয়: রাতের খাবার সুষম হওয়া উচিত এবং খাওয়ার পর ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় বিরতি রাখা দরকার।
২. ফলের রসকে স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে গণ্য করা
ফলের পুষ্টিগুণ ভালো হলেও প্যাকেটজাত ফলের রসে আস্ত ফলের তুলনায় ফাইবার বা আঁশ অনেক কম থাকে এবং অধিকাংশ পণ্যে বাড়তি চিনি মেশানো থাকে। চিনিযুক্ত পানীয় ঘনঘন পান করলে শরীরে ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যায়, কিন্তু কঠিন খাবারের মতো পেট ভরা অনুভূত হয় না।
করণীয়: অতিরিক্ত চিনি লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত জুসের পরিবর্তে আস্ত ফল এবং মিষ্টি পানীয়ের বিকল্প হিসেবে পানি রাখা ভালো।
৩. কিছুক্ষণ ব্যায়াম করা কিন্তু সারাদিন বসে থাকা
সকালে হাঁটা বা জিমে ব্যায়াম করা উপকারী হলেও তা সারাদিনের দীর্ঘ সময় বসে থাকার নেতিবাচক প্রভাব দূর করতে পারে না। দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকলে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা প্রভাবিত হয় এবং শরীর কীভাবে গ্লুকোজ ও চর্বি প্রক্রিয়াজাত করবে তাতেও ব্যাঘাত ঘটে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমা হতে পারে।
করণীয়: ব্যায়ামকে দিনের একমাত্র শারীরিক সক্রিয়তা হিসেবে গণ্য করার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মাঝে মাঝে অল্প হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা বা কাজের ফাঁকে নড়াচড়া করা জরুরি।
৪. মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানো
নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, গ্লুকোজের ভারসাম্য এবং শরীরের অন্যান্য বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা কঠিন করে তোলে এবং ঘুমের এই সমস্যা ফ্যাটি লিভার রোগের কারণ হতে পারে।
করণীয়: বারবার অপর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস উদ্বেগের বিষয়। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা উচিত।
৫. স্বাভাবিক ওজন মানেই সুস্থ লিভার- এমন ধারণা ভুল
শরীরের গঠন চিকন বা ওজন স্বাভাবিক হলেই যে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি নেই, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দক্ষিণ এশীয়সহ অনেকের ক্ষেত্রে বডি মাস ইনডেক্স (BMI) স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি (ভিসেরাল ফ্যাট) জমতে পারে। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
করণীয়: কেবল ওজনের দিকে নজর না দিয়ে কোমরের মাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং লিপিডের মতো স্বাস্থ্য নির্দেশকগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি।
লিভার সুরক্ষায় করণীয়
ফ্যাটি লিভার রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে জীবনযাত্রায় টেকসই পরিবর্তনের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, সুষম খাবার গ্রহণ, মিষ্টি পানীয় কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা পেটের মেদের মতো ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এসআর