যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি।
মূল্যস্ফীতি, ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং বিরোধীদের কার্যকর প্রচারসহ বেশ কয়েকটি বিষয় রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। বিবিসির বিশ্লেষণে দলটির বিপর্যয়ের পাঁচটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার ও তাদের পরিবার মূল্যস্ফীতির কারণে মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া ৬০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয় এবং তেলের দাম বেড়ে যায়।
যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন মার্কিন নাগরিকদের বড় একটি অংশ। জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত বলে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিতে বিশ্বাসী সমর্থকদের অনেকে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় হিসেবে দেখেছেন।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল ভোটারদের চাহিদা বুঝে প্রচার কৌশল নির্ধারণ। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্থানীয় ইস্যুকে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মানুষের আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। বিপরীতে কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্বল প্রচার এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন হ্রাস। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব সরাসরি তার দলের প্রার্থীদের ওপর পড়েছে।
প্রচারের সময় ট্রাম্প নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি ভোটারদের ব্যালটে তার নাম রয়েছে—এমনটি কল্পনা করেও ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রিপাবলিকানদের একাংশ পরাজয়ের দায় ট্রাম্পের ওপর চাপিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় প্রার্থীদের প্রচারে ট্রাম্পকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়াও দলের জন্য উল্টো ফল বয়ে এনেছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটি অংশের সমর্থন পেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এ ছাড়া অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইসিইর কর্মকাণ্ড নিয়েও দেশটির বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সংস্থাটির বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন হারানো রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো একটি বিষয় নয়; বরং অর্থনৈতিক চাপ, পররাষ্ট্রনীতির বিতর্ক, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং ডেমোক্র্যাটদের সংগঠিত প্রচারের সম্মিলিত প্রভাবেই রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এফ/ডি