বিভাজন নয়, সংলাপ; সংঘাত নয়, সহযোগিতা—জাতিসংঘ দিবসে বিশ্বনেতাদের প্রতি মহাসচিবের আহ্বান। যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট ও বৈষম্যে বিপর্যস্ত বিশ্ব; শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, জলবায়ু সংকট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। তিনি বলেছেন, মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। বর্তমান বিশ্বের সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধ নতুন করে ধারণ করা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি অঙ্গীকার আরও দৃঢ় করার সময় এসেছে।
২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় মহাসচিব এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, এই দিন শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠা উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়; এটি এমন একটি আদর্শেরও উদ্যাপন, যার ভিত্তি হলো—মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মানুষ ও রাষ্ট্রগুলোর একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার ওপর। শান্তি প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া এবং মানবাধিকার রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই বলেও বার্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের ৮১ বছরের ভূমিকা তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে অস্ত্রের পরিবর্তে কূটনীতি ও আইনের ব্যবহার, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, মানবাধিকারের প্রসার এবং যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা থেকে শুরু করে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
মহাসচিবের বার্তায় বলা হয়, জাতিসংঘের কার্যক্রম কেবল শান্তিরক্ষা বা জরুরি মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির বিকাশ, মানুষ ও পৃথিবীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নারী ও কন্যাশিশুর সমতা প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সব দেশের সমান কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাতেও সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা এবং উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
সংঘাত ও জলবায়ু সংকটে বিপর্যস্ত বিশ্ব: বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি তুলে ধরে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, বিশ্ব এখন নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সংঘাত মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে, অন্যদিকে জলবায়ু সংকট পৃথিবী ও মানুষের ভবিষ্যতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সমাজে বিভাজন আরও গভীর করছে। এসব চ্যালেঞ্জ একক কোনো দেশ বা সংস্থার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও কার্যকর সহযোগিতা।
বার্তায় প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। মহাসচিব বলেন, প্রযুক্তি এমন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর ব্যবহার, প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভাজনের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে সহযোগিতা, জাতিসংঘ দিবসের বার্তায় সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মহাসচিব। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং ভয়ের পরিবর্তে সংহতিকে বেছে নিতে হবে। মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা এবং অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতার ধারণা কাজ করেছে, বর্তমান বিশ্বেও সেই মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে বার্তায় তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আলাদা হলেও শান্তি, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার রক্ষার মতো লক্ষ্যগুলো অভিন্ন। এসব লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য।
জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার আহ্বান ।মহাসচিব তাঁর বার্তায় সব দেশের প্রতি অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজেদের অঙ্গীকার নবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর আহ্বান, বর্তমান সংকটের সময়ে দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও বাধ্যবাধকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘ সনদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে উদ্যোগী হওয়া বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মহাসচিবের বার্তায় এই নীতিগুলোর প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
মানুষের প্রয়োজন মেটাতে জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ, জাতিসংঘের ভূমিকা ও কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মহাসচিব। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মানুষের প্রয়োজন পূরণে জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী করে তোলা জরুরি। বিশ্বে সংঘাত, জলবায়ু সংকট, বৈষম্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো জটিল সমস্যা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কার্যকর কাঠামো হিসেবে সংস্থাটির সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে সব দেশের প্রতি সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, জাতিসংঘের কার্যক্রমকে মানুষের প্রয়োজন ও সময়ের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারলে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পর জাতিসংঘ দিবসের বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সহযোগিতা ও সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্যোগ ও সংঘাতের শিকার মানুষের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সংস্থাটির দীর্ঘদিনের ভূমিকা তুলে ধরে মহাসচিব ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বার্তার শেষাংশে তিনি জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার পাশাপাশি সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশ্বজুড়ে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বানই ছিল জাতিসংঘ দিবসে মহাসচিবের মূল বার্তা।
এসআর