[email protected] সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফ্রান্সে ও স্পেনে দাবানল: কারণ, ক্ষতি ও বৈশ্বিক সংকট

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬ ৯:১৫ এএম

সংগৃহীত ছবি

২০২৬ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকে সূত্রপাত হওয়া ভয়াবহ দাবানল দক্ষিণ-পশ্চিম

​ ফ্রান্স, বিশেষ করে জিরোন্দ অঞ্চলে এবং স্পেনের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল যেমন মাদ্রিদ ও আভিলায় ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরে ফ্রান্সে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৮,০০০ হেক্টর বনাঞ্চল পুড়ে গেছে, যা একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড।

​স্পেনে মাদ্রিদ অঞ্চলে প্রায় ১০,০০০ হেক্টর এবং প্রতিবেশী আভিলা প্রদেশে ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে বলে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে; আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও নিরূপণ করা হয়নি। এই দাবানলে স্পেনের ভালেন্সিয়ার কাছে মানিসেস শহরে অন্তত একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, আর ফ্রান্সে অন্তত ৫৪ জন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন।

​দাবানলের অব্যাহত বিস্তারের ফলে দুই দেশ মিলিয়ে ২,৬৭,০০০-এর বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ফ্রান্সে ১,৬৭,০০০-এর বেশি এবং স্পেনে প্রায় ১,০০,০০০ জন রয়েছেন। এছাড়া হাজার হাজার মানুষ এখনো ‘শেল্টার-ইন-প্লেস’ (নিজেদের অবস্থানে নিরাপদ আশ্রয়) নির্দেশনার অধীনে রয়েছেন, যারা সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতির সম্মুখীন হতে পারেন।

​এর মোকাবিলায় ফরাসি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় হাজার হাজার বেসামরিক ফায়ারফাইটার সক্রিয়ভাবে আগুন নেভানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে মোতায়েন করা রূপান্তরিত A400M-জাতীয় সামরিক পরিবহন ও হেভি-লিফট বিমান সমন্বিত একটি বিশাল আন্তর্জাতিক আকাশযানের বহর তাদের সহায়তা করছে।

​অনেকেরই অজানা যে, সংঘটিত হওয়ার সংখ্যার নিরিখে বিচার করলে দাবানল বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বহুগুণ বেশি ঘটে থাকে। পরিসংখ্যানগত উপাত্ত অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ লাখ দাবানলের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে বড় ও ধ্বংসাত্মক আকারের দাবানলের সংখ্যাই প্রায় আড়াই লাখ।

​এর বিপরীতে, বিশ্বজুড়ে বছরে ক্ষয়ক্ষতি সাধনকারী বড় ভূমিকম্পের সংখ্যা গড়ে মাত্র ১৩০ থেকে ১৫০টি, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন সৃষ্টি হয় ৮০ থেকে ৯০টি এবং বড় আকারের বন্যার ঘটনা ঘটে কয়েকশ থেকে সর্বোচ্চ কয়েক হাজার বার। দাবানল এত বেশি মাত্রায় সংঘটিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর উৎপত্তির কারণগুলো নিত্যনৈমিত্তিক। বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের সামান্যতম অসতর্কতা থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য দাবানলের সূত্রপাত ঘটে।

​দাবানল মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক উভয় কারণে সংঘটিত হলেও মোট দাবানলের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই মানুষের অসতর্কতা ও কর্মকাণ্ডের ফলে ঘটে। এর মধ্যে রয়েছে বনভোজনের পর ক্যাম্পফায়ারের আগুন সম্পূর্ণ না নেভানো, জ্বলন্ত সিগারেট বা দিয়াশলাই বনাঞ্চলে ফেলা, কৃষিজমির বর্জ্য পোড়ানোর আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া, বৈদ্যুতিক লাইনের শর্ট-সার্কিট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বনে আগুন লাগানোর ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

​অন্যদিকে, বাকি ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাবানল প্রাকৃতিক কারণেও ঘটে থাকে, যার প্রধান উৎস হলো শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলে বজ্রপাত। এছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা চরম তাপমাত্রায় শুকনো পাতা ও ঘাসে স্বতঃস্ফূর্ত দহনের ফলেও প্রাকৃতিক দাবানলের সূত্রপাত হয়।

​এই কারণগুলোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি খরা, উচ্চ তাপমাত্রা, বাতাসে নিম্ন আর্দ্রতা এবং প্রবল বাতাস সরাসরি আগুন সৃষ্টি না করলেও বনাঞ্চলকে অত্যন্ত দাহ্য করে তোলে এবং প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গকে ভয়াবহ রূপ দিয়ে দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করে।

​দাবানলের আরেকটি বিশেষ কারণ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করা। কিছু রাষ্ট্রে কৃষিজীবী, গবাদিপশু পালনকারী ও বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বনে আগুন লাগায়, যা প্রায়শই দুর্বল আইনের শাসন বা পরোক্ষ রাজনৈতিক মদদের কারণে ঘটে থাকে।

​ব্রাজিলের অ্যামাজন অঞ্চলে প্রধানত গোচারণভূমি তৈরি এবং সয়াবিন চাষের জন্য বন পরিষ্কার করতে ‘স্ল্যাশ অ্যান্ড বার্ন’ বা গাছ কেটে পুড়িয়ে ফেলার পদ্ধতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়; উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার উপাত্তমতে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে অ্যামাজনে অগ্নিকাণ্ডের মাত্রা রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার প্রায় পুরোটাই ছিল মানবসৃষ্ট এবং অবৈধভাবে ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট।

​প্রায় একই চিত্র দেখা যায় ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে সস্তায় পাম তেল ও কাগজের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য বিশাল পিটভূমিতে কর্পোরেশনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে বন পরিষ্কার করে, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাবানলে রূপ নেয় এবং ভয়াবহ ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

​এছাড়া বলিভিয়া, পেরুর মতো দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক দেশে সনাতন পদ্ধতির কৃষিকাজ ও জুম চাষের জন্য ব্যাপকভাবে আগুন ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, এইসব রাষ্ট্র সরাসরি বনে আগুন না লাগালেও, অর্থনৈতিক স্বার্থে জমি পরিষ্কার করার এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অপরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ডগুলোই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ দাবানলে পরিণত হয়।

​বিশ্বের সব স্থানে দাবানলের মারাত্মক প্রভাব না থাকলেও, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও জলবায়ুগত কারণে বেশকিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল প্রায়শই এই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অত্যন্ত দাহ্য ইউক্যালিপটাস বনাঞ্চলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং শুষ্ক জলবায়ু ও তীব্র বাতাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া সবচেয়ে বেশি দাবানলপ্রবণ এলাকা। গ্রীষ্মকালে অত্যধিক তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকাও (যেমন স্পেন, গ্রিস, ফ্রান্স, ইতালি) নিয়মিত এই দুর্যোগের শিকার হয়ে থাকে।

​অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে রাশিয়া (সাইবেরিয়া) ও কানাডার বিশাল তৈগা বা বোরিয়াল বনভূমিতে দাবানলের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এছাড়া, মূলত কৃষিকাজ ও জমি পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে মানুষের সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অ্যামাজন অববাহিকা এবং ইন্দোনেশিয়ার কার্বনসমৃদ্ধ পিটভূমিতে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী দাবানলের সৃষ্টি করে; পাশাপাশি সাব-সাহারান আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সাভানা তৃণভূমিতেও প্রতি বছর বিপুল পরিসরে দাবানল সংঘটিত হয়ে থাকে।

​অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত দাবানল পৃথিবীর অনেক পরিবেশতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের একটি অপরিহার্য ও স্বাভাবিক অংশ। দাবানলে পুড়ে যাওয়া মৃত উদ্ভিদ ও পাতার অবশিষ্টাংশ ছাইয়ে পরিণত হয়ে মাটিতে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরতা ও পুষ্টি উপাদান বৃদ্ধি করে।

​এছাড়া, আগুন জঙ্গলের ঘন ছাউনি পরিষ্কার করে মাটিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছানোর পথ তৈরি করে, যা নতুন উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও জৈববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করে এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও রোগজীবাণু ধ্বংস করে বনাঞ্চলকে সুস্থ রাখে। এমনকি কিছু নির্দিষ্ট উদ্ভিদ, যেমন বিশেষ প্রজাতির পাইন গাছের বীজ কেবল আগুনের প্রচণ্ড তাপের সংস্পর্শে এলেই উন্মুক্ত হয়ে বংশবিস্তার করতে পারে।

​তবে বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বেশি মাত্রায় সংঘটিত দাবানল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানবসৃষ্ট দাবানলগুলো এই প্রাকৃতিক দাবানলের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব এত বেশি মাত্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, তা অনেক সময় ইকোসিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে তাকে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলছে।

​‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’-এর তথ্যমতে, দুই দশকে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) হেক্টরের বেশি গাছের আচ্ছাদন বা বনভূমি শুধুমাত্র দাবানলের কারণে পুড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেক বনাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে পুনরুদ্ধার হলেও অ্যামাজন, অস্ট্রেলিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো অঞ্চলে বারবার ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে অনেক বনভূমি চিরতরে তৃণভূমি বা সাভানায় পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, যা স্থায়ী বনভূমি ধ্বংসের প্রমাণ।

​জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির হিসাবটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০১৯-২০২০ সালের অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ দাবানলেই প্রায় ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী রয়েছে। এরা হয় মারা গেছে অথবা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই ধরনের চরম মাত্রার দাবানলের ফলে অনেক স্থানীয় ও বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণী তাদের একমাত্র আবাসস্থল হারিয়ে চিরতরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।

​দাবানল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে অনেক প্রলয়ঙ্করী হলেও, এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং এর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে মানুষের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট করণীয় রয়েছে। প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বনভূমিতে ক্যাম্পফায়ার সম্পূর্ণ নেভানো নিশ্চিত করা, কৃষিবর্জ্য পোড়ানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক লাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

​বনভূমি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে শুষ্ক মৌসুমের পূর্বে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিয়ন্ত্রিত দহনের মাধ্যমে বনের অতিরিক্ত শুষ্ক পাতা ও ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ফেলা এবং নির্দিষ্ট স্থানে গাছপালা পরিষ্কার করে ফায়ারব্রেক বা কৃত্রিম ফাঁকা জায়গা তৈরি করে আগুনের বিস্তার রোধ করা যেতে পারে।

​পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে স্যাটেলাইট, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালালে আগুনের সূত্রপাত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব, যা পরবর্তীতে প্রশিক্ষিত ফায়ারফাইটার এবং ওয়াটার-বম্বিং এয়ারক্রাফট বা হেলিকপ্টারের সাহায্যে দ্রুত নেভানো সহজ হয়।

​পরিশেষে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো অপরিহার্য, কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও চরম খরাই বনাঞ্চলকে দাবানলের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

​তবে দাবানল নিয়ে আমাদের কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে। আমরা মনে করি দাবানলের কারণে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ঘাটতি হতে পারে। তবে মনে রাখা উচিত, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রায় ২১ শতাংশ অক্সিজেন বিদ্যমান। বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত এই অক্সিজেনের পরিমাণ এতই বিশাল যে, পৃথিবীর সব বনভূমি একত্রে পুড়ে গেলেও তা বায়ুমণ্ডলের মোট অক্সিজেনের ১ শতাংশেরও অনেক কম অংশ ব্যবহার করবে। আবার দাবানলের সময় স্থানীয় অঞ্চলে মানুষের যে শ্বাসকষ্ট হয়, তা অক্সিজেনের শূন্যতার কারণে ঘটে না।

​মূলত বাতাসে ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইড এবং সূক্ষ্ম ক্ষতিকারক বস্তুকণা (PM2.5) ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাতাস দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। এছাড়াও ‘বনভূমি পৃথিবীর অধিকাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে’—এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা।

​স্থলভাগের বনভূমি যতটুকু অক্সিজেন উৎপাদন করে, তার প্রায় সমপরিমাণ অক্সিজেন বনের প্রাণী, উদ্ভিদের নিজস্ব শ্বসন প্রক্রিয়া এবং জৈব পচনে ব্যবহৃত হয়ে যায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের মূল ও বৃহত্তম উৎস হলো মহাসাগরে অবস্থিত ‘ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’।

​দাবানলের কারণে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ঘাটতি হয় না; কেবল এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর নির্ভর করে দাবানল নিয়ে নিশ্চিন্ত বা উদাসীন থাকার কোনো সুযোগ নেই। অক্সিজেনের অভাব না ঘটলেও, দাবানল থেকে নির্গত ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইড এবং সূক্ষ্ম বিষাক্ত বস্তুকণা (PM2.5) বাতাসকে দূষিত করে ভয়াবহ মাত্রার শ্বাসকষ্ট ও জনস্বাস্থ্য সংকটের সৃষ্টি করে।

​এছাড়া, দাবানল কেবল গাছপালাই পোড়ায় না; এটি বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে, শত কোটি বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ঘটায় এবং অমূল্য জীববৈচিত্র্যকে চিরতরে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়। এর পাশাপাশি, বনভূমি পুড়ে যাওয়ার ফলে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করে জলবায়ু পরিবর্তনকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। মানুষের জীবন, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্য এবং পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশের ওপর দাবানলের এই বহুমুখী ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বিবেচনা করলে, শুধুমাত্র অক্সিজেনের যুক্তিতে উদাসীন থাকাটা মানবসভ্যতার জন্য আত্মঘাতী একটি ভুল হবে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর