দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার বাস্তবতায় বাংলাদেশে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে এগিয়ে নিতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ। এ লক্ষ্যে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও বেসরকারি খাতকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগরায়ণকে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু-সহনশীল করতে টেকসই ভবন (Sustainable Building) নির্মাণে নতুন গতি আনতে একত্র হয়েছে বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং উন্নয়ন অংশীদাররা। রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা, জ্বালানি-দক্ষ অবকাঠামো, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত নগরায়ণশীল দেশ। প্রতিবছর লাখো মানুষ শহরমুখী হওয়ায় নতুন আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ভবন খাত এখন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় ঝুঁকির উৎসে পরিণত হচ্ছে। তাই এখনই পরিকল্পিত ও টেকসই নির্মাণব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টেকসই ভবন শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমায়, বিশুদ্ধ বাতাস ও প্রাকৃতিক আলো নিশ্চিত করে, পানির অপচয় কমায় এবং কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এসব ভবন অনেক বেশি কার্যকর।
সভায় জানানো হয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে এমন নির্মাণব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে নকশা, নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি ব্যবহার এবং ভবনের পুরো জীবনচক্র পরিবেশের ওপর সর্বনিম্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আলোচনায় সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা জাতীয় পর্যায়ে টেকসই ভবন নীতিমালা বাস্তবায়ন, আধুনিক বিল্ডিং কোড কার্যকর করা, গবেষণা জোরদার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়ে একমত হন।
বক্তারা বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান, স্থপতি, প্রকৌশলী, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবাইকে এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। কারণ টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশীদারিত্ব অপরিহার্য।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি ব্যবহারের বড় একটি অংশ এবং কার্বন নিঃসরণের উল্লেখযোগ্য অংশ ভবন খাত থেকে আসে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই পরিবেশবান্ধব নির্মাণব্যবস্থা চালু করা গেলে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং দেশের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হবে।
সভায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs), প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং জাতীয় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। টেকসই ভবন নির্মাণ সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না; প্রয়োজন বাস্তবায়নের সক্ষমতা। এজন্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাণকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সবুজ নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ভবনগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে টেকসই নির্মাণ মডেল বাস্তবায়নেরও সুপারিশ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টেকসই ভবন নির্মাণ শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না; এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নির্মাণ খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতের স্মার্ট ও সবুজ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে উঠবে এমন পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর ওপরই।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তাই ভবিষ্যতের নগরায়ণ কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে আজকের সিদ্ধান্ত। সরকার ও জাতিসংঘের এই যৌথ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু জ্বালানি সাশ্রয় বা কার্বন নিঃসরণই কমবে না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য গড়ে উঠবে আরও নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল নির্মাণ খাতের একটি কর্মসূচি নয়; বরং দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
এসআর