বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সমুদ্রপথে কর্মরত লাখো নাবিকের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
তিনি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে নাবিকেরা যে ভূমিকা পালন করছেন, তার তুলনায় তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই তারা রাজনৈতিক সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনার শিকার হতে পারেন না।
আগামী ২৫ জুন পালিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক নাবিক দিবস (Day of the Seafarer 2026) উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে গুতেরেস এসব কথা বলেন। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “Carrying world trade. Carrying the risks.” অর্থাৎ, “বিশ্ব বাণিজ্য বহন করছে, বহন করছে ঝুঁকিও।”
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন নাবিকেরা। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। খাদ্যশস্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি তেল ও গ্যাস—সবকিছুই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেন এই নাবিকরাই।
তিনি বলেন, “বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন যে পণ্য ব্যবহার করেন, তার বড় অংশই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়। কিন্তু এই বিশাল ব্যবস্থার পেছনে যারা নিরলস পরিশ্রম করছেন, সেই নাবিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি।”
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ: সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকটের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও পণ্য পরিবহন করা হয়। কিন্তু সামরিক উত্তেজনা, হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক নাবিক দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
গুতেরেসের ভাষায়, “যখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তখন প্রায়ই নিরীহ নাবিকেরা সেই সংঘাতের মাঝখানে আটকে পড়েন। হাজার হাজার মাইল দূরে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা বিশ্বকে সচল রাখার দায়িত্ব পালন করেন। অথচ সংকটের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে হলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
‘দাবার ঘুঁটি’ নয়, মানবিক মর্যাদার অধিকারী : বাণীতে জাতিসংঘ মহাসচিব স্পষ্টভাবে বলেন, নাবিকেরা কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিরোধ, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারেন না।
তিনি বলেন, “নাবিকেরা কখনোই কোনো সংঘাতের বলি বা দাবার ঘুঁটি হতে পারেন না। তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চালিকাশক্তি। তাদের মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অঞ্চলে জাহাজ আটক, নাবিকদের জিম্মি করা, সশস্ত্র হামলা, জলদস্যুতা এবং যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে নাবিকদের পেশাগত ঝুঁকিও আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান: নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতা, সরকার এবং আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক শ্রমমান এবং নাবিকদের অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত চুক্তিগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমুদ্রসীমা ও আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন সম্পর্কিত আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, যাতে কোনো নাবিক বা বাণিজ্যিক জাহাজ অযথা হয়রানি কিংবা হুমকির মুখে না পড়ে।
তৃতীয়ত, বিশ্বের যেকোনো সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, নিরাপদ সমুদ্রপথ শুধু নাবিকদের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
‘সমুদ্র-অন্ধত্ব’ কাটানোর আহ্বান: গুতেরেস বাণীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘সীব্লাইন্ডনেস’ (Sea Blindness) বা ‘সমুদ্র-অন্ধত্ব’।
তার মতে, স্থলভাগে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন না। ফলে নাবিকদের অবদানও অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
তিনি বলেন, “কোনো বড় সংকট না হওয়া পর্যন্ত আমরা বুঝতেই পারি না যে বিশ্ব অর্থনীতি কতটা সমুদ্রনির্ভর। নাবিকদের কঠোর পরিশ্রম ছাড়া আধুনিক জীবনযাত্রা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।”
নাবিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আহ্বান: বাণীর শেষাংশে বিশ্বের সব নাবিকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক নাবিক দিবসে আমরা তাদের সাহস, দক্ষতা, আত্মত্যাগ এবং দায়িত্ববোধকে সম্মান জানাই। ঝড়, সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও যারা বিশ্বকে সচল রাখছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব।”
গুতেরেস আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে নাবিকেরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারবেন এবং কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য তাদের জীবন দিয়ে দিতে হবে না।
এসআর