বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে এমন সব সংক্রমণ ভূমিকা
রাখছে, যা চিকিৎসাসাধ্য অথবা প্রতিরোধযোগ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট অনকোলজি’-তে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ৮টি ক্যানসার আক্রান্তের ঘটনার মধ্যে অন্তত ১টির পেছনে কোনো না কোনো সংক্রমণ দায়ী। সামান্য সচেতনতা, টিকাদান, নিয়মিত পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এর একটি বড় অংশ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি)-র জ্যেষ্ঠ এপিডেমিওলজিস্ট ও গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক গ্যারি ক্লিফোর্ড জানান, ক্যানসার বাসা বাঁধার অনেক আগেই তা প্রতিরোধের কার্যকর উপায় রয়েছে। প্রতিরোধমূলক এসব কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদ্বিচ্ছা, অর্থায়ন, সঠিক প্রচার এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জরুরি।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান ও ক্যানসারের প্রধান সংক্রমণসমূহ
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৩ লাখ নতুন ক্যানসার আক্রান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল নানা ধরনের সংক্রমণ, যা মোট ক্যানসার শনাক্তের প্রায় ১২ শতাংশ। ক্যানসার তৈরিতে ভূমিকা রাখা প্রধান সংক্রমণগুলো হলো:
হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি (এইচ. পাইলোরি): এটি মূলত পাকস্থলীর ক্যানসারের জন্য দায়ী।
হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি): প্রধানত জরায়ুমুখের ক্যানসার সহ প্রজনন অঙ্গ ও মুখ-গলার ক্যানসারের অন্যতম কারণ। (কেবল এইচ. পাইলোরি ও এইচপিভি এই দুই সংক্রমণের কারণেই ২০২৪ সালে ১৫ লাখের বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন)।
হেপাটাইটিস বি (এইচবিভি): প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের জন্য দায়ী, যার অধিকাংশই ছিল লিভার ক্যানসার।
অ্যাপস্টাইন-বার ভাইরাস (ইবিভি): প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের কারণ; বিশেষ করে নাক ও গলার সংযোগস্থল (নাসোফ্যারিংস) এবং মাথা-ঘাড়ের ক্যানসারের পেছনে এর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
হেপাটাইটিস সি (এইচসিভি): প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের সঙ্গে জড়িত, যার বেশিরভাগই লিভার ক্যানসার।
গবেষণার অন্যতম লেখক হ্যারিয়ট রামগে উল্লেখ করেন, শীর্ষ পাঁচটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী সংক্রমণের চারটির জন্যই (এইচপিভি, হেপাটাইটিস বি, এইচ. পাইলোরি ও হেপাটাইটিস সি) অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে।
বৈষম্য ও আঞ্চলিক প্রভাব
‘গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরি’-র ‘ক্যানসার টুডে’ তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমণজনিত ক্যানসারের চাপ বিশ্বজুড়ে সমান নয়। মোট সংক্রমণজনিত ক্যানসারের প্রায় ৭৭ শতাংশই ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এটি মূলত টিকাদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতাকেই নির্দেশ করে। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ভেরোনিকা ফেডিরকো জানান, যুক্তরাষ্ট্রেও আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের ক্যানসার আক্রান্তের ৩.৪ শতাংশই হয়েছিল এই ধরনের সাতটি সংক্রমণের কারণে।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, শরীরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী সংক্রমণ থাকার অর্থই ক্যানসার হওয়া নয়। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ স্থায়ী হলে ধূমপান, জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জটিলতায় এটি ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
ঝুঁকি কমানোর উপায়
ক্যানসারের জটিল ঝুঁকির মধ্যেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে একটি অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকরা।
১. টিকাদান: হেপাটাইটিস বি এবং এইচপিভি (HPV)-র অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ক্যানসার প্রতিরোধে বুস্টার ভূমিকা রাখে।
২. স্ক্রিনিং ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা: এইচ. পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার কারণে পাকস্থলীতে প্রদাহ হলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তা নিরাময় করা সম্ভব। একইভাবে হেপাটাইটিস সি পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত হলে সঠিক চিকিৎসায় লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো যায়।
৩. সুরক্ষামূলক জীবনযাপন: নিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতি, শারীরিক মিলনে প্রতিরোধক ব্যবহার ও এইচআইভি প্রতিরোধক ওষুধের যথাযথ ব্যবহার ক্যানসার সৃষ্টিকারী ভাইরাসের বিস্তার রোধ করে।
মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ড. ন্যান্সি লি বলেন, ফ্লু থেকে বাঁচতে যেভাবে ভ্যাকসিন নেওয়া হয়, ক্যানসার থেকে রক্ষায়ও তেমনি জনসাধারণের মাঝে প্রতিরোধমূলক টিকাদান জোরদার করা জরুরি। ক্যানসার সৃষ্টিকারী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করা গেলে বিশ্বজুড়ে ক্যানসারে আক্রান্তের হারও লক্ষণীয়ভাবে কমে আসবে।
এসআর