[email protected] রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত, মৃত্যু বেড়ে ৯২৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ ১০:৩৮ এএম

সংগৃহীত ছবি

দেশে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে হামের প্রাদুর্ভাব চললেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর খবর আসছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতেও প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের কাছাকাছি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে।


সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম—দুই হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২৮ জনে।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১ জন। পরীক্ষার মাধ্যমে ১৮ হাজার ২০৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৪০ শিশু। এর মধ্যে ৮৭৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৬৪ জন নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশু, অসম্পূর্ণ টিকাগ্রহণ, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোও মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করার ওপর।

বিশেষ করে কোনো টিকা না পাওয়া এবং অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের দ্রুত খুঁজে টিকার আওতায় আনতে হবে। আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি ও চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, অক্সিজেন, ওষুধ ও পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।


অপুষ্টি ও দেরিতে চিকিৎসায় বাড়ছে ঝুঁকি
হামে আক্রান্ত অনেক শিশু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা, অপুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো জটিলতা তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।


বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অনেক শিশু রোগের জটিল পর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গুরুতর অবস্থায় থাকা কিছু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হচ্ছে।


সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৮২ শতাংশ জীবনের প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া বুকের দুধ পায়নি। তবে এ তথ্যকে সরাসরি মৃত্যুর একক কারণ হিসেবে দেখা না হলেও শিশুর পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।


গণটিকার পরও পুরোপুরি থামেনি সংক্রমণ
হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেও সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। জুনের হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০২ শতাংশ।


তবে ভিটামিন এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যার সঙ্গে হাম-রুবেলা টিকা পাওয়া শিশুর তুলনায় প্রায় ৪০ লাখের ব্যবধান পাওয়া গেছে। ফলে কাগজে টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও বাস্তবে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশ্লেষণেও দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং ২০২০ সালের পর জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকা।


ছোট শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
হামের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট শিশুরা। জ্বর ও শরীরে র‍্যাশের পাশাপাশি গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।


ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ বছরের কম। তাদের মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর হার ছিল ৬৬ শতাংশ। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।


বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায় ৩৫৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, হাম টিকা নেওয়ার বয়স হলেও টিকা না পাওয়া শিশুদের ৯৭ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। এক ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যেও ৯২ শতাংশের পরীক্ষায় রোগটি শনাক্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং গুরুতর রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।

এসআর

সম্পর্কিত খবর