[email protected] শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

ডাইনিংয়ের খাবারে আস্থা হারাচ্ছেন কুবি শিক্ষার্থীরা

বাবলু দেব, কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩ জুলাই ২০২৬ ১১:৫৩ পিএম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন কমছে।

পাঁচটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিম্নমানের খাবার, একঘেয়ে মেনু, স্বাদের অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নির্ধারিত সময়ে খাবার না পাওয়াসহ নানা সমস্যার কারণে তারা হলের ডাইনিং এড়িয়ে বাইরে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাড়ছে তাদের মাসিক ব্যয়ও।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই একই ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়।

নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে গেলে খাবার শেষ হয়ে যায়, আবার অনেক সময় আগেভাগেই খাবারের সংকট দেখা দেয়।

এসব কারণে অনেক আবাসিক শিক্ষার্থী নিয়মিত বাইরের হোটেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হলের ডাইনিং ব্যবস্থা আরও সংকটের মুখে পড়বে।

কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসাইন বলেন, "দুপুরে মাছ, মাংস কিংবা ডিম দেওয়া হলেও খাবারে তেমন স্বাদ থাকে না। বিশেষ করে রাতের খাবারের মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়। বাধ্য হয়ে প্রায়ই বাইরের হোটেলে খেতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন দেখা যায় না।"

ডাইনিংয়ের বাবুর্চিদের ভাষ্য, প্রতিদিনের মেনুতে সাধারণত এক বেলা মাছ এবং অন্য বেলা মাংস রাখা হয়। এছাড়া সপ্তাহে এক-দুই দিন শাক-সবজি, ভাজি বা ভর্তা পরিবেশন করা হয়।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক সপ্তাহজুড়েই ব্রয়লার মুরগি ও মাছের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। খাবারের স্বাদ ও মান নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ, ফলে বাইরের খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে।

বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "ডাইনিংয়ে প্রায়ই একই ধরনের ব্রয়লার মুরগি দেওয়া হয়, আবার মাংসের টুকরোগুলোও খুব ছোট হয়। যে টাকা দিয়ে হলে খেতে হয়, সেই খরচে বাইরের হোটেলে আরও ভালো ও বৈচিত্র্যময় খাবার পাওয়া যায়।"

মিল ম্যানেজাররা বলছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত বাজেটের মধ্যে বৈচিত্র্যময় খাবার পরিবেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।

অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে একাধিক তরকারি রাখা যায় না। মাছের দাম বেশি হওয়ায় তুলনামূলক কম খরচের ব্রয়লার মুরগির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বর্তমান মিল রেটে উন্নত মানের খাবার দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তারা জানান।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মিল ম্যানেজাররাও প্রশাসনের কাছে ডাইনিংয়ের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, নারী শিক্ষার্থীদের দুটি আবাসিক হল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।

তাদের দাবি, অনেক সময় খাবারের মান এতটাই খারাপ থাকে যে কয়েকজন শিক্ষার্থী ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছেন। এ কারণে অধিকাংশ ছাত্রীও হলের খাবারের পরিবর্তে বাইরের হোটেল বা বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাসমিয়া ফারিন বলেন, "মিলের জন্য যে টাকা নেওয়া হয়, সে অনুযায়ী খাবারের মান হওয়া উচিত। কিন্তু অনেক সময় এমন খাবার দেওয়া হয়, যা খেয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই খরচে বাইরে অনেক ভালো ও স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়া যায়।"

রাতের খাবারের টোকেন সংগ্রহের সময় নিয়েও রয়েছে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ।

টিউশনি বা অন্যান্য কাজের কারণে অনেক শিক্ষার্থী রাত ৯টার আগে হলে ফিরতে পারেন না। অথচ টোকেন সংগ্রহের সময়সীমা রাত ৯টা পর্যন্ত হওয়ায় তারা হলের খাবার থেকে বঞ্চিত হন।

সুনীতি শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিমি বলেন,
"রাত ৯টার পর আর টোকেন দেওয়া হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বাইরে খেয়ে থাকেন।"

তিনি আরও বলেন,
"খাবারের মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং টোকেন সংগ্রহের সময় বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা আবার হলের ডাইনিংয়ে আগ্রহী হবে।"

এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক ও কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ মো. হারুন বলেন, "একঘেয়ে মেনুর কারণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে গিয়েছিল।

তাই পরীক্ষামূলকভাবে কাজী নজরুল ইসলাম হলে মেনু পরিবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও অনেক শিক্ষার্থী বাইরের খাবারই বেশি পছন্দ করছেন।"

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ডাইনিংয়ের জন্য কোনো ভর্তুকি পাওয়া যায় না। তবুও প্রশাসনের কাছে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হচ্ছে এবং নতুন উপাচার্যের কাছেও ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা জানানো হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেট বা দোকান ভাড়ার মতো নিজস্ব আয়ের উৎস থাকায় সেখান থেকে ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তেমন কোনো স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো. জনি আলম বলেন,
"খাবারের মান ও ডাইনিং ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতি মাসে মতবিনিময় সভা করা হয়।

শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে একাধিক বাবুর্চি নিয়োগ এবং মেনু পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।"

তিনি আরও জানান,
"আমি নিয়মিত হলের ডাইনিং তদারকি করি। অনেক সময় কাউকে না জানিয়েই খাবার খেয়ে দেখি এবং যেখানে সমস্যা পাই, সেখানে দ্রুত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিই।"

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের প্রাধ্যক্ষ ড. সুমাইয়া আফরীন সানি বলেন, "অনেক ছাত্রী খরচ কমাতে নিজেরা রান্না করেন। এ কারণেও ডাইনিংয়ে খাবার গ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।"

খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,"অনেক শিক্ষার্থীর খাদ্যপণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নাও থাকতে পারে।

তারপরও আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ মানের খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি এবং নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রাখি।

এসআর

সম্পর্কিত খবর