ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘লাইক-ভিউ’ নির্ভর অ্যালগরিদম ও এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে দ্রুত ছড়াচ্ছে ঘৃণা ও বিভ্রান্তি। এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই যুগে পৃথিবী যেমন অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছেছে, তেমনি নতুন কিছু বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এখন ঘৃণা, বিভাজন ও অপপ্রচারকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে United Nations সতর্ক করে বলেছে, ঘৃণামূলক বক্তব্য শুধু সামাজিক সম্প্রীতির জন্য হুমকি নয়; এটি প্রায়শই সহিংসতা, বৈষম্য, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সূচনা ঘটায়। জাতিসংঘের মতে, সমাজে বিভাজন তৈরির সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ঘৃণা ছড়ানো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত বহু দাঙ্গা, জাতিগত সংঘাত এবং মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে ঘৃণামূলক প্রচারণার ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে নিয়মিতভাবে অবমাননা, অপমান কিংবা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সমাজে অবিশ্বাস ও বৈরিতার পরিবেশ তৈরি করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘৃণাই রূপ নেয় সহিংসতায়।
বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল, জনমত প্রভাবিত করা এবং সামাজিক বিভক্তি তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও হেট স্পিচ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, অভিবাসী, শরণার্থী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা প্রায়ই এই ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
অ্যালগরিদমের ফাঁদে বন্দি ডিজিটাল সমাজ: ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ যত দ্রুত হয়েছে, ততই বেড়েছে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যা মানুষের আবেগ, ক্ষোভ, বিতর্ক এবং বিভক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারণ এসব বিষয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্ল্যাটফর্মে তাদের সময় বাড়ায়।
ফলে সত্য, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তেজনা, বিতর্ক এবং চটকদার বিষয়বস্তু। তৈরি হয়েছে এক নতুন বাস্তবতা—‘লাইক-ভিউ অর্থনীতি’।
এই অর্থনীতিতে সত্য তথ্যের চেয়ে বেশি মূল্য পাচ্ছে ভাইরাল হওয়ার ক্ষমতা। কিছু অতিরঞ্জিত দাবি, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচারণাও মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে শুধুমাত্র বেশি লাইক, শেয়ার ও ভিউ পাওয়ার আশায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অনেকেই জনপ্রিয়তার জন্য তথ্য যাচাইয়ের ন্যূনতম দায়িত্ববোধও উপেক্ষা করছেন। এর ফলে অপপ্রচার, গুজব এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ক্রমেই সাধারণ বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
ভিউয়ের জন্য উসকানি, জনপ্রিয়তার জন্য বিভাজন: বর্তমানে অনলাইনে সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় এমন কনটেন্টগুলোর বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে বিতর্ক, উসকানি কিংবা বিভক্তির সঙ্গে জড়িত। কারণ শান্ত, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার তুলনায় উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ফলে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সচেতনভাবেই এমন কনটেন্ট তৈরি করছে, যা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, বিদ্বেষ এবং সংঘাত উসকে দেয়। স্বল্পমেয়াদে এগুলো জনপ্রিয়তা এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য তৈরি করছে ভয়াবহ ঝুঁকি।
পরিচয় গোপনের আড়ালে বাড়ছে অপরাধ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার কিংবা পরিচয় গোপন রাখার সুযোগও ঘৃণামূলক প্রচারণাকে উৎসাহিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে অপপ্রচার চালায়, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেয় অথবা অন্যকে হয়রানির শিকার করে।
ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্যও কঠিন হয়ে উঠছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন শঙ্কা:
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার মানবজীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, যোগাযোগ এবং ব্যবসা—প্রায় প্রতিটি খাতেই এআই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে একই সঙ্গে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন খুব সহজেই ভুয়া ছবি, কৃত্রিম ভিডিও, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং বাস্তবসম্মত মিথ্যা তথ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে ঘৃণামূলক বক্তব্য, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
বাকস্বাধীনতা কখনো ঘৃণা ছড়ানোর লাইসেন্স নয়: জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে, বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক মানবাধিকার হলেও সেটিকে কখনোই ঘৃণা, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতা ছড়ানোর বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো অনুযায়ী, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতাকে উৎসাহিত করে এমন বক্তব্য প্রতিরোধ করা প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাও জরুরি।

সংকট মোকাবিলায় কী করা প্রয়োজন?: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সচেতনতা ও শিক্ষা।
প্রথমত, মানুষকে ঘৃণামূলক বক্তব্য শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি বিভ্রান্তিকর—সেই বিচার করার দক্ষতা এখন সময়ের অন্যতম প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন বিদ্বেষ, সাইবার বুলিং কিংবা অপপ্রচারের শিকার ব্যক্তিদের আইনি, সামাজিক ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কনটেন্ট নীতিমালা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারগুলোকেও বিদ্যমান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘৃণামুক্ত ডিজিটাল ভবিষ্যতের আহ্বান: বিশ্বকে আরও নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল পরিবেশের দিকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘের ‘স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড প্ল্যান অব অ্যাকশন অন হেট স্পিচ’ এবং ‘গ্লোবাল প্রিন্সিপালস ফর ইনফরমেশন ইন্টেগ্রিটি’ গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া সুস্থ সমাজ গঠন সম্ভব নয়। তাই ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা, বিভেদের পরিবর্তে সংলাপ এবং অপপ্রচারের পরিবর্তে সত্য ও দায়িত্বশীল তথ্যচর্চাকে প্রতিষ্ঠা করার এখনই সময়।
কারণ ঘৃণা কখনো সমাজকে এগিয়ে নেয় না; বরং ধীরে ধীরে তাকে বিভক্তি, সংঘাত ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।
এসআর