প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রশিক্ষণের সময়সীমা বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার।
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
প্রশিক্ষণে আসছে নতুন কাঠামো
প্রতিমন্ত্রী জানান, শিক্ষকদের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকরা শুরুতে পিটিআইতে দুই মাস সরাসরি প্রশিক্ষণ নেবেন। এরপর বিদ্যালয়ে ফিরে পাঠদানের পাশাপাশি নির্ধারিত পাঠ্যসূচি ও মডিউল অনুসারে বাকি প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করবেন।
তিনি জানান, বর্তমানে এক বছর মেয়াদি শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য নতুন মডিউল তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এই কাঠামোর আওতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে দুই মাস সরাসরি প্রশিক্ষণের পর বাকি ১০ মাস অনলাইন ও সরাসরি পদ্ধতি মিলিয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
পিটিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
ববি হাজ্জাজের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পিটিআইগুলো বছরে প্রায় সাত হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন হলে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগগুলোকেও যুক্ত করা হবে।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করে শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদানের দায়িত্বে রাখার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
২০২৭ সালের মধ্যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের লক্ষ্য
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। অন্য এলাকাগুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
শিক্ষকদের হাতে ট্যাব, শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও স্মার্ট ক্লাসরুম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, এর লক্ষ্য শুধু শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়া নয়; বরং শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে গুগলসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দুর্গম এলাকার যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগ
দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, আদালতের রায়ের পর প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। রায়ের চূড়ান্ত সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর পদোন্নতির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি সম্পন্ন হলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথ আরও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বইয়ের চাপ কমানো, গল্পের মাধ্যমে পাঠদান এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাওর, চর ও পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম বিদ্যালয়ে শিক্ষক আকৃষ্ট করতে বিশেষ ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানে আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার বলে জানান ববি হাজ্জাজ।
এসআর