[email protected] মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩

অপ্রতিম হত্যা: ১২ প্রশ্ন তুলে কুবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন

কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭:৩৪ পিএম

সংগৃহীত ছবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

একই সঙ্গে কুমিল্লা জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি এবং তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন।

 

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ১২টি বিষয় তুলে ধরে নিজেদের প্রশ্ন ও অভিযোগের কথা জানান তাঁরা।

 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও তাঁকে উদ্ধারে রাতেই পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, নিখোঁজ শিশুটিকে খোঁজা এবং পরদিন মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

 

তাঁদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার আগেই ঘটনাস্থল ও মরদেহের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ সেখানে প্রায় বেলা ৩টার দিকে পৌঁছায়। এ ছাড়া আসামি তুহিনের জবানবন্দিতে একটি খামারে অপ্রতিমকে হত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে ফরেনসিক টিম যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ ও ঘটনাস্থল পরীক্ষা করেনি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

 

পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় ও আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় প্রেস ব্রিফিং হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় পরিবর্তন করে দুপুর ১টা করা হয়। এরপরও পুলিশ প্রায় ২টার দিকে সেখানে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হওয়ার আগেই ব্রিফিং শেষ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

 

আনাসকে আটক ও পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে আনাসকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও পরদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করেছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। এ ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

 

আসামিদের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পুলিশের দেওয়া বয়সের পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করে শিক্ষার্থীরা আসামিদের বয়স নির্ধারণে ‘অসিফিকেশন টেস্ট’ করার এবং এর প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান।

 

এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে অতীতে মোটরসাইকেল চুরি সংক্রান্ত অভিযোগ বা মামলা ছিল কি না এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁরা কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন কি না, তা তদন্তের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের ‘কেবিজি’ নামের একটি গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তের দাবি জানান তাঁরা। একই সঙ্গে কোটবাড়ি ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং এবং মাদকাসক্তদের কার্যক্রম খতিয়ে দেখে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা।

 

পুলিশকে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুলিশ সন্তোষজনক কোনো তথ্য বা জবাব দেয়নি। পাশাপাশি ১৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত চার দফা দাবির বিষয়েও পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

 

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পরিবর্তে ‘ব্যাড প্যারেন্টিং’ প্রসঙ্গ সামনে এনে ঘটনার দায় অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনায় প্রত্যেকের ভূমিকা এবং এর পেছনে কোনো মদদদাতা রয়েছে কি না—সবকিছু তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

 

কুবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহনাজ বলেন, পুলিশের বক্তব্যে তাঁরা অসংগতি দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের রক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

 

আরেক শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের তথ্যের সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহের কিছু বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

 

ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফ হাসান জিদনী বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে আনাস নামে কাউকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও হত্যাকাণ্ডের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের আনসার ক্যাম্প এলাকা থেকে আনাস নামে একজনকে ধরে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পরদিন এসআরবির প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁকে সকাল ৭টায় ছেড়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলেও তিনি দাবি করেন।

সাইফ হাসান আরও বলেন, আসামিদের আটক ও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, একজন অভিযুক্তের বয়স ১৫ বছর দেখিয়ে তাকে কারাগারের পরিবর্তে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা সম্ভব। তাঁর ভাষ্য, অপরাধী কিশোর, যুবক বা প্রাপ্তবয়স্ক—যেই হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অপ্রতিম হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কুমিল্লার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি একটি স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধসহ চার দফা দাবি জানিয়েছিলেন।

এসআর

সম্পর্কিত খবর