[email protected] বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩

একই ঘর থেকে কুবির ক্যাম্পাসে, সহোদর-যমজদের অনন্য গল্প

কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭:২৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

একই পরিবারে বেড়ে ওঠা, একই ছাদের নিচে শৈশব কাটানো কিংবা পড়ার টেবিলে পাশাপাশি বসে স্বপ্ন দেখার স্মৃতি—ভাই-বোনের সম্পর্ককে করে তোলে আরও গভীর।

সেই সম্পর্ক যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও পাশাপাশি থাকার সুযোগ তৈরি করে, তখন পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও তৈরি হয় আলাদা এক বন্ধনের গল্প।
কুমিল্লার কোটবাড়িতে অবস্থিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ একরের ক্যাম্পাসে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর আনাগোনা। তাদের মধ্যেই রয়েছেন এমন কয়েকজন, যারা শুধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন, পরস্পরের ভাই-বোন কিংবা যমজ।

একই পরিবারের এই শিক্ষার্থীদের কেউ একই বিভাগে, কেউ আবার ভিন্ন বিষয়ে পড়লেও ক্যাম্পাসজীবনের নানা মুহূর্তে একে অপরের সহযোগী হয়ে উঠেছেন।
ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার—বিভিন্ন বিষয়ে তারা একে অন্যের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ফলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা তাদের কাছে শুধু শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করারও একটি সুযোগ।


একই বিভাগে যমজ দুই বোন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন যমজ দুই বোন কাজী ফাহমিদা কাঁনন ও কাজী সানজিদা কাঁকন। ফাহমিদা ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, আর সানজিদা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের।
চেহারা ও চলাফেরায় মিল থাকায় ক্যাম্পাসে তাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে মজার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কেউ কেউ তাদের গুলিয়ে ফেলেন।
দুই বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথটিও ছিল কিছুটা ভিন্ন। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবার একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যজন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। তবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা থেকেই পরে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন ছোট বোন সানজিদা। শেষ পর্যন্ত বড় বোনের এক ব্যাচ জুনিয়র হিসেবে কুবির সাংবাদিকতা বিভাগেই ভর্তি হন তিনি।
সানজিদা কাঁকনের ভাষায়, একই বিভাগে পড়ার কারণে তিনি বড় বোনের কাছ থেকে একাডেমিক বিষয়ে নানা ধরনের সহযোগিতা পান। বড় বোন আগে থেকেই বিভাগে থাকায় পড়াশোনার বিভিন্ন বিষয় বুঝতে তার সুবিধা হয়।


নিজের ভর্তি হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথমবার ভর্তি প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল। পরে বড় বোনের কাছ থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার কথা শুনে বিভাগটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরিবার থেকে আইন পড়ার সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন তিনি। 


ভিন্ন বিষয়ে পড়েও পাশাপাশি দুই ভাই-বোন
কুবির গণিত বিভাগ ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন শরিফুল আলম বিজয় ও সুলতানা রাজিয়া আশা। দুজনই ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। একজনের পড়াশোনার বিষয় গণিত, অন্যজনের সাংবাদিকতা—বিষয়ভেদে পার্থক্য থাকলেও ক্যাম্পাসজীবনে তাদের বন্ধন বেশ দৃঢ়।


ক্লাসের বাইরে ক্যাফেটেরিয়া কিংবা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে সময় কাটান তারা। বোনের হাতের রান্না উপভোগ করাও তাদের দৈনন্দিন জীবনের আনন্দের একটি অংশ।


শরিফুল আলম বিজয় বলেন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাই-বোনের সুযোগ পাওয়াটা তার জীবনের অন্যতম আনন্দের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বড় হওয়ায় দূরে থেকে থাকা তাদের জন্য সহজ ছিল না। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় একে অপরের খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো সহজ হয়েছে।


তিনি জানান, তাদের বড় ভাইও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনজনই কুবিতে পড়াশোনা করেছেন। তবে ভিন্ন শিক্ষাগত পটভূমির কারণে তিনি গণিত এবং তার বোন সাংবাদিকতা বিভাগ বেছে নিয়েছেন।


আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়, একই স্বপ্ন
দুই ভাই মাহবুব হাসান ও হালিমের গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। মাহবুব পড়ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে, আর তার ভাই হালিম অধ্যয়ন করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।


বিশ্ববিদ্যালয় দুটি আলাদা হলেও তাদের যোগাযোগে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। ক্লাস, পরীক্ষা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সমস্যায় তারা নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করেন।
মাহবুব হাসান জানান, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পথ সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত অফলাইন কোচিং করার সুযোগ পাননি তারা। বাসায় থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র তিন মাস আগেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের ধারণা খুব বেশি ছিল না।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও দূরত্বের কারণে ভর্তি হতে না পারার মতো কঠিন পরিস্থিতিতে দুই ভাই একে অপরকে সাহস দিয়েছেন বলে জানান মাহবুব। তার ভাষায়, পুরো সংগ্রামের সময় তারা পরস্পরের পাশে থেকেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।


বড় বোনের পথ অনুসরণ করে কুবিতে ছোট বোন
একই বিভাগে পড়ছেন সালমা বেগম ও ফাতেমা বেগম। সালমা ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এবং ফাতেমা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। দুজনেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের।


ছোটবেলা থেকেই বড় বোন সালমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন ফাতেমা। বড় বোন কুবিতে ভর্তি হওয়ার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত একই বিভাগে ভর্তি হন ছোট বোন।


সালমা বেগম বলেন, একই বিশ্ববিদ্যালয় ও একই বিভাগে দুই বোনের পড়াশোনা তাদের জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। একসঙ্গে পড়াশোনা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনের সময় একে অপরকে সহযোগিতা করার কারণে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।


তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে তারা পরস্পরকে উৎসাহ দেন এবং সহযোগিতা করেন। একই জায়গায় পড়াশোনা করার সুবাদে তাদের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও আরও গভীর হয়েছে। তার কাছে এটি শুধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা নয়; বরং একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা ও সেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।


সময় গড়াবে, একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ হবে। থেমে যাবে নিয়মিত ক্লাস, ক্যাম্পাসের আড্ডা কিংবা ব্যস্ততার দিনগুলো। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল মাটির পথ, মুক্তমঞ্চ, শহীদ মিনার আর ক্যাম্পাসের নানা প্রান্তজুড়ে সহোদরদের একসঙ্গে কাটানো সময়গুলো তাদের জীবনে স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর