[email protected] বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ৭:১২ পিএম

সংগৃহীত ছবি

পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

 আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানো ও করের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বৈঠক হয়। সেখানে এসব প্রস্তাব ও সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খেজুরের শুল্ক কমানোর প্রস্তাবটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে।

 

আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, খেজুর আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিকল্প পথে আমদানি করতে গিয়ে খরচ বাড়ছে। ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

বাণিজ্যমন্ত্রী খেজুরের জাত, গুণগত মান ও বাজারদরের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নানা মানের খেজুর আমদানি হয়। তাই সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ না করে বাস্তব বাজারদর ও মান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।

 

তাদের মতে, নির্ধারিত শুল্কায়নমূল্য প্রকৃত আমদানি মূল্যের তুলনায় বেশি হওয়ায় খরচ বাড়ছে। ফল আমদানিতেও করের বোঝা কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

 

রমজানের প্রস্তুতিতে বেড়েছে নিত্যপণ্যের আমদানি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুর আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

 

এ সময়ে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ ছাড়া ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ৮ লাখ ৫ হাজার টনের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।

 

চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। এ সময়ে চিনির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনের।

 

রমজানে ইফতারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছোলার আমদানিতেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা এসেছে ৮২ হাজার টন। আগের বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১২ হাজার টন। এ সময়ে ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।

 

অন্যদিকে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬৪ হাজার টন বেশি। এ পণ্যের জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের। খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার টন।

 

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় পণ্য আগেভাগে আমদানি এবং বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ছোট ডাল মিলের ব্যবসায় সংকটের অভিযোগ

বৈঠকে ডাল ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম স্থিতিশীল রাখার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কারণে ছোট ডাল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ছে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন বলেন, দেশের ছোলার চাহিদা প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মসুর ডালের চাহিদারও প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে পূরণ করতে হয়। এ অবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, বৈঠকে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর বিষয়টিও উত্থাপন করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ডিম ও মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা

পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানান, দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সম্প্রতি প্রতি পিস সাড়ে ১১ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে। তাদের মতে, এই দাম উৎপাদন খরচের কাছাকাছি।

খামারে রোগবালাইয়ের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতির আশঙ্কা করছেন না তারা। তবে রমজানে সকালের খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন আসায় ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়লে বাজারদরেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

প্রতিনিধিরা জানান, সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রচলিত আমদানি নীতিতে ডিম ও মাংস আমদানির সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক বাজারের দামে নজর রাখছে সরকার

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। বিপরীতে মসুর ডালের দাম কমেছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য এবং দেশের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বৈঠকে তুলে ধরা হয়।

 

সভায় জানানো হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পরিবর্তন আনা গেলে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলতে পারে।

 

রমজানে সেহরি ও ইফতারকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর, ডিম ও মুরগির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শরবত, মিষ্টি ও ইফতারি তৈরিতে চিনির ব্যবহার বাড়ে। অন্যদিকে পেঁয়াজু, বেগুনি ও ডালের বড়ার মতো খাবার তৈরিতে ভোজ্যতেল ও মসুর ডালের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। ছোলা ও খেজুরের বার্ষিক চাহিদার বড় অংশও এ মাসে পূরণ হয়।

 

এসব পণ্যের অধিকাংশের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আগাম আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এসআর

সম্পর্কিত খবর