একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের হাতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ হতে যাচ্ছে।
এতে চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমসহ বিভিন্ন ব্যাংকের বিতর্কিত সাবেক পরিচালক ও মালিকদের পরিচালনা পর্ষদে ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার। মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে খসড়াটির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারায় সংকটে থাকা ব্যাংকের পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত অগ্রিম অর্থ জমা দিলে এ ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত এই ধারার আওতায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। ফলে ধারাটি বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করছে সরকার।
এই কারণেই ১৮(ক) ধারা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের কোনো তপশিলি ব্যাংক মূলধন সংকট, তারল্য ঘাটতি, দেউলিয়াত্ব বা অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়লে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এটি বিল আকারে উত্থাপনের পর বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশের কয়েকটি বিধান সংশোধন করা হয়। একই সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক দায়, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংক খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
এই ধারার উদ্দেশ্য ছিল সংকটে পড়া ব্যাংককে পুরোপুরি অকার্যকর না করে পুনর্গঠন করা, মূলধন ও তারল্য সংকট মোকাবিলা করা এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। একই সঙ্গে ব্যাংক পুনরুদ্ধারে সরকারের সরাসরি আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যও ছিল।
সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় সরকার মনে করছে, ধারাটি আর কার্যকর রাখার প্রয়োজন নেই। তাই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে এটি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংশোধনী খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং সম্পন্ন হলে আইনটি চূড়ান্ত করে কার্যকর করার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১৮(ক) ধারা বাতিল হলেও ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের অন্যান্য বিধান কার্যকর থাকবে। কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট কিংবা অস্তিত্বের গুরুতর ঝুঁকিতে পড়লে বিদ্যমান রেজ্যুলেশন কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় রেজ্যুলেশন কাঠামো চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাতিলের উদ্যোগকে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ সরকারের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে বিতর্কিত মালিক ও পরিচালকদের অল্প অগ্রিম অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতে সমালোচনা ছিল। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
১৮(ক) ধারা বাতিল হলে একীভূত বা সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরোনো বিতর্কিত মালিকদের আগের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সীমিত হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা।
এসআর