মনে হতে পারে, হকারদের দোকানের জায়গায় মানুষ ভুল করে হাঁটছে। বাস্তবে সেটিই এখন শনির আখড়ার চিত্র। বিকেল গড়াতেই ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত ও সড়কের পাশের জায়গাগুলো দখল করে বসে পড়েন ভ্রাম্যমাণ হকাররা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অবৈধ অটোরিকশার জটলা। সন্ধ্যা নামার পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, পথচারীদের জন্য রাস্তা পার হওয়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই হয়ে ওঠে দুর্ভোগের কারণ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬০ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শনির আখড়া, দনিয়া ও জিয়া সরণি। এসব এলাকায় রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। অথচ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর সড়ক ও ফুটপাতের বাস্তব চিত্র বদলে যায়।
বিশেষ করে শনির আখড়া বর্ণমালা স্কুলসংলগ্ন মূল সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রায় ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়কটির বড় একটি অংশ বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হকার ও অটোরিকশার দখলে চলে যায়। ফলে কোথাও কোথাও কার্যত ১৫ থেকে ২০ ফুটের মতো জায়গা দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে বাধ্য হয়। এর সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়ায় তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট ও জনদুর্ভোগ।
শুধু সড়ক নয়, ফুটপাতও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দখলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ফার্নিচারের দোকানের পণ্য ফুটপাত ও চলাচলের জায়গা দখল করে প্রদর্শন করা হয়। ফলে পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়কের ওপর নেমে হাঁটতে হয়। আর ব্যস্ত সড়কে অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পথচারীর এই মিশ্র চলাচল বাড়িয়ে দিচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় সন্ধ্যার পর। অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও রোগীর স্বজন—সবাইকে একই সড়কে হকার, অটোরিকশা ও যানজটের সঙ্গে লড়াই করে চলতে হয়। কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় দীর্ঘ সময় লেগে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, সন্ধ্যার পর শনির আখড়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো যেন নাগরিক চলাচলের জায়গা না হয়ে ‘অস্থায়ী বাজারে’ পরিণত হয়।
প্রশ্ন উঠছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কে দিনের পর দিন কীভাবে এভাবে দখল বাড়ছে? স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হকার ও অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, হকারদের সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে অনেক সময় তাঁরা উল্টো মারমুখী আচরণ করেন। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতেও ভয় পান। স্থানীয়দের আরও দাবি, শনির আখড়া, জিয়া সরণি ও দনিয়া কলেজসংলগ্ন এলাকায় হকারদের আধিপত্য ও দখলকে কেন্দ্র করে অতীতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সড়ক ও ফুটপাত দখলের বিষয়টি শুধু নাগরিক দুর্ভোগ নয়, আইনশৃঙ্খলার দিক থেকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
মাঝেমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযান বেশির ভাগ সময় দিনের প্রথম ভাগে সীমাবদ্ধ থাকে। অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকেল হলেই অনেক জায়গায় আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান স্থায়ী সমাধান না হয়ে অনেকটা সাময়িক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এখানেই বড় প্রশ্ন—উচ্ছেদ যদি করতে হয়, তাহলে দিনের বেলায় শুধু দোকান সরিয়ে দিয়ে সন্ধ্যার পর আবার দখল ফিরে আসার সুযোগ কেন থাকবে?
অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখা কঠিন। মিরপুরেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অভিযানের পর হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ডিএনসিসির অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়; পরে এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয়।
তবে মিরপুরের ঘটনাই দেখিয়েছে, শুধু উচ্ছেদ নয়—ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান, সময়ভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ এবং নিয়মিত নজরদারির মতো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এর আগে মিরপুর-১০ এলাকায় ডিএনসিসি ‘স্ট্রিট ভেন্ডর ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত অংশে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় বড় পরিসরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার নজিরও রয়েছে। আগারগাঁও থেকে মিরপুর-২ পর্যন্ত ৬০ ফুট সড়ক ও আশপাশের এলাকায় এক অভিযানে ৫০০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। ওই এলাকায় দখলের কারণে ৬০ ফুট সড়কের প্রস্থ কোথাও কোথাও ৩০-৪০ ফুটে নেমে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তাহলে শনির আখড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একই ধরনের ধারাবাহিক ও কার্যকর ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান নয়—এ প্রশ্ন স্থানীয়দের।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের উচ্ছেদ কার্যক্রম তুলনা করে স্থানীয়দের মধ্যে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, উত্তর সিটির কিছু এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদে যে ধরনের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়, দক্ষিণ সিটির শনির আখড়া-দনিয়া এলাকায় তার তুলনায় কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগ কম। অবশ্য দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক বাস্তবতা ও অভিযানের ধরন এক নয়; তাই সরাসরি তুলনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে নাগরিকের প্রশ্নটি সরল—রাস্তা কি হকারের, নাকি মানুষের? ফুটপাত কি দোকানের পণ্য রাখার জায়গা, নাকি পথচারীর হাঁটার জায়গা?
শনির আখড়ার বাসিন্দারা চান, উচ্ছেদ অভিযান হলে তা যেন শুধু সকালবেলার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে হকারদের জীবিকার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করার দাবি রয়েছে। কারণ দখলমুক্ত নগর নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে জনসাধারণের চলাচলের সড়ক ও ফুটপাত অনির্দিষ্টকালের জন্য দখলে রাখার সুযোগ তৈরি করা হলে ভোগান্তির শিকার হবেন নগরবাসীই।
শনির আখড়ার মানুষ তাই আর বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযান নয়, চান নিয়মিত অভিযান, কার্যকর নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি সড়ক-ফুটপাত ব্যবস্থাপনা।
কারণ একটি ৬০ ফুটের সড়ক যদি দখলদারদের কারণে ১৫-২০ ফুটে নেমে আসে, আর মানুষ যদি নিজের হাঁটার ফুটপাতেই জায়গা না পায়, তাহলে সেটি শুধু যানজটের সমস্যা নয়—এটি সরাসরি নাগরিক অধিকার ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
শনির আখড়ার মানুষ এখন জানতে চান—সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার দায়িত্ব কার, আর সেই দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন হবে কবে?
নাগরিকদের প্রশ্ন, সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স, সিটি কর ও অন্যান্য কর দেওয়ার পরও যদি একটি এলাকার মানুষ নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা, নিরাপদে সড়ক ব্যবহার এবং স্বাভাবিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই কর দেওয়ার বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য অধিকার কোথায়? নাগরিকরা কর দেন উন্নত সড়ক, দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ চলাচল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ নগর ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশায়। অথচ সড়ক-ফুটপাত দখল হয়ে গেলে, যানজটে নাকাল হতে হলে কিংবা স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়লে সেই নাগরিক সুবিধার বাস্তব চিত্র নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
এখন প্রশ্ন শুধু সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হবে কি না—প্রশ্ন হলো, এসব দখল বারবার ফিরে আসছে কেন এবং এর স্থায়ী সমাধানের দায়িত্ব কার? দিনের পর দিন জনদুর্ভোগ চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দায় এড়িয়ে যায়, তাহলে নাগরিকদের জবাব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান হলে তার পরদিনই আবার দখল ফিরে এলে সেই অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও কর্তৃপক্ষকে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে। কোথায়, কার দায়িত্বে এবং কীভাবে দখলদারিত্ব নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—তারও স্বচ্ছ জবাব প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশন জনগণের করের অর্থে পরিচালিত একটি জনসেবা প্রতিষ্ঠান। তাই নাগরিকদের দেওয়া প্রতিটি টাকার বিপরীতে সড়ক, ফুটপাত ও জনপরিসর ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বও কর্তৃপক্ষের। শনির আখড়ার মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না; তারা শুধু তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকারটুকু চান। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকাতে কী স্থায়ী পদক্ষেপ নেয় এবং জনগণের অভিযোগের কী জবাব দেয়—এখন নজর সেদিকেই। কারণ নাগরিকের কর নেওয়ার যেমন হিসাব আছে, তেমনি সেই করের বিনিময়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করারও জবাবদিহি থাকতে হবে।
এসআর