দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কর্মচারীর অভাবে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ১৫২ জন মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৭৮ সালে সুজালপুর ইউনিয়নের চাকাই গ্রামে ঢাকা-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
২০১৩ সালে ৩১ শয্যা থেকে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি। মহাসড়কের পাশে অবস্থান এবং আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মানুষের চিকিৎসা নিতে আসার কারণে এখানে রোগীর চাপও তুলনামূলক বেশি।
হাসপাতালটিতে পরিচ্ছন্নতা ও সহায়ক কর্মীর সংকট প্রকট। ৩১ শয্যার হাসপাতালের জন্যই ছয়টি এমএলএসএস পদ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে একজনও কর্মরত নেই। পিয়ন ও আয়ার পদেও সংকট রয়েছে। অন্যদিকে, ৫০ শয্যার হাসপাতালটি মাত্র চারজন সুইপার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্তি থাকলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকলেও গাইনি, অ্যানেসথেশিয়া ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে নিয়মিত সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে জটিল অবস্থায় থাকা গর্ভবতী নারীদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। তবে দূরত্ব ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগী শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মহাসড়কসংলগ্ন হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চাপও এখানে বেশি।
কিন্তু অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এ ধরনের রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনটিও নষ্ট থাকায় এ সেবা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি এ বিভাগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকও নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১০টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের জন্য চিকিৎসকসহ ৪৩টি পদ প্রয়োজন।
এর মধ্যে ১২টি কনসালট্যান্ট পদও রয়েছে। বিপরীতে চিকিৎসক কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে তিনজন প্রেষণ বা সংযুক্তিতে অন্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ৩৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২২ জন। শূন্য রয়েছে ১৩টি পদ। অন্যদিকে, ৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নতুন পদ সৃষ্টি হয়নি। ৩১ শয্যার কাঠামো অনুযায়ী থাকা ২১টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৩ জন; শূন্য রয়েছে আটটি পদ।
২০২৬ সালে বর্তমান সরকার অর্থোপেডিক্সসহ কয়েকটি বিভাগে চিকিৎসক নিয়োগ দিলেও সংশ্লিষ্টদের কর্মস্থলে না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৩০তম বিসিএসের অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক মো. মনিরুল ইসলাম বীরগঞ্জে যোগদানের পর থেকে প্রেষণে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।
একইভাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিয়োগ পাওয়া ৩২তম বিসিএসের কার্ডিওলজি চিকিৎসক মো. মামুনুর রশিদ বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের পর থেকে সংযুক্তির মাধ্যমে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের বেতন বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরাও জনবল সংকটের কারণে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝলঝলি গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, শ্বাসকষ্টের কারণে ভোরে তাঁর বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
ভোগনগর ইউনিয়নের ভোলানাথপুর গ্রামের শাহিনুর রহমান জানান, তাঁর স্ত্রীকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সন্তান প্রসব না হওয়ায় রোগী কষ্ট পাচ্ছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁকে বীরগঞ্জ উপজেলা সদরের কোনো ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে সিজার করানোর কথা ভাবছেন তাঁরা।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, আগে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হতো।
বর্তমানে মহাসড়কের পাশে অবস্থানের কারণে রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জনে দাঁড়িয়েছে।
আগে হাসপাতালে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী ভর্তি থাকলেও এখন নিয়মিত ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী অবস্থান করছেন। এতে শয্যাসংকট তৈরি হচ্ছে।
ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরাও চিকিৎসা নিতে আসছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আফরোজ সুলতানা লুনা বলেন, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সচল রয়েছে। তবে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি নষ্ট।
জনবল সংকটের পাশাপাশি কার্ডিওলজি, গাইনি, সার্জারি ও অর্থোপেডিক্স বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ জরুরি।
এ অবস্থায় বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কর্মচারী নিয়োগের জন্য দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মো. মনজুরুল ইসলাম মঞ্জুর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ/এইচ/টি