[email protected] বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সারের ডিলার হলেন এমপির ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের বউ

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৬ এএম

সংগৃহীত ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের স্ত্রীর নাম থাকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী। দলীয় ত্যাগী নেতা-কর্মীদের উপেক্ষা করে স্বজনদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দলের একাংশ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নে একজন করে মোট ১৩ জনকে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার দাবি, তালিকায় গোকর্ণ ইউনিয়নের মোহাম্মদ আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, গোয়ালনগর ইউনিয়নের নুরুন্নাহার আক্তার তাঁর ভাগ্নে শরীফুল ইসলামের স্ত্রী এবং সদর ইউনিয়নের আরক মিয়া তাঁর ভগ্নিপতি।

আরক মিয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর ভাই বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বিএনপির কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, গোয়ালনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন সংসদ সদস্যের ভাগ্নে শরীফুল ইসলাম।

এ কারণে তাঁর স্ত্রী নুরুন্নাহারের নামে সার ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। নুরুন্নাহারের শ্বশুর সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে সার ডিলার নিয়োগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানান।

গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলামও তাঁর পোস্টে ডিলার নিয়োগে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অর্থ লেনদেনকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, সরকারি নিয়ম ও বিধি অনুসরণ করেই তাঁর ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের স্ত্রী ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট তিনটি ইউনিয়নে তাঁদের তুলনায় যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগকে গুজব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

নতুন ডিলারদের কয়েকজনের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, বুড়িশ্বর ইউনিয়নের জসিম মিয়া আগে নিষিদ্ধ যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি উপজেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভাগ্নে।

কুন্ডা ইউনিয়নের রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদল সভাপতি অনু মিয়ার ভাই। অনু মিয়ার আগের ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার পর তাঁর ভাই নতুন করে নিয়োগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

ফান্দাউক ইউনিয়নের শারমীন আক্তার যুবদলের স্থানীয় সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী। তবে তাঁদের কেউই আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেন ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ হারিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, হরিপুরের আরিফুল ইসলাম ঢাকায় আসবাবপত্রের ব্যবসা করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

সার ডিলার নিয়োগের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিধিমালা অনুযায়ী, ডিলারশিপের জন্য আবেদনকারীর কমপক্ষে ২৫ টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকার কথা।

গুদামের নির্ধারিত মাপ দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট, প্রস্থে ১৫ ফুট ও উচ্চতায় ১০ ফুট। তবে নতুন নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন ডিলারের গুদাম এই শর্ত পূরণ করে কি না, তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগের তালিকায় দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তাঁদের অনেকে মনে করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের দুজন ও বিএনপির দুজন নেতা অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বরাদ্দের অভিযোগ শোনার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তাঁদের নামের তালিকা জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।

চূড়ান্ত তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না বলে জানান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান বলেন, তিনি সরকারি চাকরিতে রয়েছেন এবং সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ বিষয়ে এর বাইরে তাঁর কিছু বলার নেই।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় ১০৬টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৮২৫টি।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য অগ্রাধিকার অনুযায়ী তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠায়। পরে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ২৯২ জনের আবেদন চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এসআর

সম্পর্কিত খবর