[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

তাজমীন হত্যা মামলায় অমীমাংসিত বহু প্রশ্ন, অন্য কারও সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ৮:৩৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

কুমিল্লার কিশোরী জান্নাতুন তাজমীন (১৫) হত্যার ঘটনায় একজন অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার এবং তার ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের পরও তদন্তে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, কীভাবে কিশোরীকে নির্ধারিত গন্তব্যের বদলে দূরের একটি নির্জন এলাকায় নেওয়া হলো—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

 

এ ঘটনায় সুমন মিয়া নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা যায়নি। ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, সুমনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো চলছে এবং অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

নির্ধারিত পথের বদলে দীর্ঘ ঘোরানো রাস্তা

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকা থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় যেতে দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। কিন্তু কিশোরীকে নিয়ে সুমন যে পথে গিয়েছিলেন, সেটি ছিল প্রায় ৩০ কিলোমিটারের। এই দীর্ঘ পথের মধ্যে কী ঘটেছিল এবং অন্য কারও সহায়তা ছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

 

পুলিশ জানায়, গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের নূরজাহান হোটেলের পাশের তিশা বাস কাউন্টারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় ওঠে তাজমীন। ৩০০ টাকায় তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে রাজি হন চালক সুমন। কিন্তু তিনি বাড়ির দিকে না গিয়ে প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিজরা বাজারের দিকে যান। পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ফসলের মাঠের কাছে পৌঁছান।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবে ওই গন্তব্যে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগার কথা থাকলেও কিশোরীকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

 

রাতের যাত্রা ও লোকেশন পাঠানোর ঘটনা

তদন্তে জানা গেছে, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবার ফোনে নিজের অবস্থান জানিয়ে একটি লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। তখন তার বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেননি। ভোরে লোকেশনটি দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন তিনি। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করছিল। পরে সেখানে গিয়ে মেয়েকে শনাক্ত করেন বাবা।

 

কিশোরী কেন লোকেশন পাঠিয়েছিল, তখন সে কোনো বিপদের আশঙ্কা করছিল কি না কিংবা এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত জানায়নি।

 

পুলিশের দাবি, নির্জন স্থানে পৌঁছানোর পর তাজমীন সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে বাধা দেন। জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এবং ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে ফরেনসিক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

 

অটোরিকশায় আর কেউ ছিলেন কি না, তদন্ত চলছে

ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে। ফুটেজে তাকে পেছনের বাঁ পাশের আসনে দেখা যায়। গাড়িতে অন্য কেউ ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানখেত থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের কাছেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কিছু কাপড়চোপড় ও একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়। মরদেহের গলায় গামছা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

কক্সবাজার থেকে ফেরার পর কী ঘটেছিল

পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমীন। পরে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসে কুমিল্লায় ফেরে সে। রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর একটি দোকানে মোবাইল ফোন চার্জ দেয়। পরে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খোঁজে।

৪ থেকে ৭ অক্টোবরের মধ্যে তার যাতায়াত ও অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার দিন বিকেলে তাজমীন পরিবারকে রাতে বাড়ি ফেরার কথা জানিয়েছিল বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা আগে উল্লেখ করেছিলেন।

চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার, উদ্ধার আইফোন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সুমন অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে রেখে কিশোরীর আইফোন নিয়ে চলে যান। পরে তিনি একটি পুকুরে গোসল করেন এবং অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে ফোনটি পুকুরপাড়ের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। এরপর চট্টগ্রামে চলে যান।

গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বাখরাবাদ এলাকা থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না এবং যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, সেগুলো তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর