[email protected] রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেসবুকে রাজুর সঙ্গে পরিচয়, ১৭ দিনের সম্পর্কের সূত্রে কক্সবাজার গিয়েছিল তাজমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৩ এএম

সংগৃহীত ছবি

কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত রাজু চৌধুরী (২০) নামে এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল বলে জানা গেছে।

রাজু সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। পরিচয়ের পর তাদের সম্পর্কের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৭ দিন।

তাজমিন চার দিন নিখোঁজ থাকার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময়ের মধ্যে সে প্রথমে পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়, পরে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারে পাড়ি জমায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলেছিল সে। তবে ঠিক কবে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কক্সবাজার থেকে ফেরার পর বুধবার রাতে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সামনে তাজমিনকে বাস থেকে নামতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা প্রবেশমুখে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে তার নামার দৃশ্য ধরা পড়ে।

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ শনিবার রাতে কালবেলাকে জানান, ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত ৮টার পর তাজমিন ও তার এক পুরুষ বন্ধু টিকিট কাটতে কাউন্টারে এসেছিল। পরদিন বুধবারের যাত্রার জন্য যুবকটি একটি টিকিট কেনে। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে।

আবদুল্লাহ জানান, হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেন এবং বাসযাত্রী হিসেবে ওই তরুণীকে শনাক্ত করেন। পুলিশের প্রয়োজনে তথ্য দেওয়ার প্রস্তুতিও নেন। পরে জানতে পারেন, তাজমিনের সঙ্গে থাকা যুবকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়। তদন্তে হত্যার সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার (৩৫) সংশ্লিষ্টতার কথা সামনে আসায় ওই যুবকের বিষয়ে আর খোঁজ নেননি তিনি।

এদিকে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। সে সময় তাজমিন এক বান্ধবীর সঙ্গে থাকার কথা বলেছিল। মেয়েকে নিয়ে আসতে তার বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন মা। কিন্তু বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন তা জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুত্ব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো বিপদে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের ওপর নজর রাখার পাশাপাশি তার বন্ধুদের সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে হারাতে হয়েছে তাকে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তাজমিনের মা যে বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তিনি বয়সে তাজমিনের চেয়ে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাজমিনের মোবাইল গেমে আসক্তি এবং পরিবারের সঙ্গে তার আচরণ নিয়েও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তথ্য সংগ্রহ করছেন।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, দীর্ঘদিন তিনি তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি ছিল চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনাও করত সে।

তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং কাজের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন।

তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে মনোমালিন্য হলে তাজমিন কখনো কখনো হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত বলেও জানান ওই শিক্ষক।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডে একমাত্র অভিযুক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে তাজমিন।

সেখান থেকে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। পুলিশের অভিযোগ, চালক সুমন তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না হলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না এবং এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না।

এসআর

সম্পর্কিত খবর