[email protected] রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

শাহজালাল মাজারে খাদেমদের অপরাধ নেটওয়ার্ক, দান আত্মসাৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১১:৫০ এএম

সংগৃহীত ছবি

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি সংঘবদ্ধ চক্র

 দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। মাজারের দান-অনুদান আত্মসাৎ, মানতের পশু ও ধর্মীয় সামগ্রী নিয়ে বাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে এই চক্রটি তাদের অন্ধকার সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে।

জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক নজরদারি ও অনুসন্ধানে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন মাজারের দানবাক্স সিলগালা করে সিসিটিভির নজরদারিতে খোলার পর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে; মাত্র ২৫ দিনেই মাজার থেকে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ অর্থ, ১২টি দেশের মুদ্রা, স্বর্ণালংকার এবং ৬৫টি ছাগল পাওয়া গেছে।

​সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, মাজারে দীর্ঘদিন ধরে টাকা-পয়সার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব রাখার নিয়ম ছিল না। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সম্প্রতি দানবাক্সগুলো সিলগালা করা হয়। প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলা মাজারের দানবাক্সগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না থাকায় দানের অর্থ সরাসরি বস্তায় ভরে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হলে ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়। পরবর্তীতে ২২ জুন ইতিহাসে প্রথমবার সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে সর্বসাধারণের সামনে দানবাক্স খোলা হলে মাত্র ৪ দিনেই ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। এরপর ১১ জুলাই পুনরায় গণনা করে আরও ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও রহস্যময় চিরকুট উদ্ধার করা হয়।

​স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ ফয়সাল জানান, এই ২৫ দিনের হিসাবই বলে দেয় যে যুগের পর যুগ ধরে এখানে কী পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দানবাক্স সিলগালা করার পর দানের টাকা কম দেখাতে মাজারের কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। কুমিল্লা থেকে আসা দর্শনার্থী শাহেরা খাতুন জানান, দানবাক্সে টাকা কম দেখাতে দরগার দেওয়ান নামধারী কেরানি জহুর উদ্দির রশীদ দানের টাকা সরাসরি ভক্তদের হাত থেকে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের রিনা খানম জেবা জানান, মাজারের দানের টাকায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই সিলেটের জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে সিলেট ছাড়তে হয়েছে। সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, সিসিটিভির নজরদারিতেও তারা মাত্র ৪০-৪৫ ভাগ টাকা বাক্সগুলোতে পেয়েছেন, বাকি টাকা মাজারের লোকজন ভক্তদের বিভ্রান্ত করে হাতে হাতে নিয়ে নিয়েছেন। ভক্তদের বলা হতো—সরকারকে দিতে চাইলে বক্সে ফেলুন, আর মাজারকে দিতে চাইলে আমাদের দিন।

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোতাওয়াল্লি ও খাদেমদের আয়ের মূল উৎস মাজারের সম্পত্তি (মার্কেট, দোকানপাট, পুকুর) এবং ডেক-দানবাক্সের টাকা। এর বাইরে প্রবাসী ও ভিআইপি ভক্তদের দেওয়া নজরানার লাখ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার তারা সরাসরি আত্মসাৎ করেন। বাৎসরিক ওরশের সময় আসা গবাদিপশু ও নগদ অর্থও খাদেমদের বিভিন্ন উপ-গ্রুপ ভাগ করে নেয়। এমনকি পশুর মানত নিয়ে প্রতারণামূলক বাণিজ্য চলে; কেরানি সামুন ও তার সহযোগীরা একটি মানতের গরু বা ছাগল সুকৌশলে ভক্তদের কাছে সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করেন। মাজারে প্রায় ৫০০ খাদেমের মধ্যে ৩০ জন মুরুব্বি খাদেম কেরানি সামুন ও খোকন ওরফে বকরি খোকনের আশীর্বাদে দৈনিক আয়ের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। প্রতিদিন একজনের ‘বারি’ বা ২৪ ঘণ্টার ডিউটি থাকে, যেখান থেকে গড়ে ৪-৫ লাখ এবং ছুটির দিনে ১০ লাখ টাকার বেশি আয় হয়। কোনো সাধারণ খাদেম সংকটে পড়লে খোকন চড়া সুদে দানের টাকা ধার দিয়ে তাদের দাসত্বে বন্দি করে রাখেন।

​সামুন ও খোকন সিন্ডিকেটের অন্যতম চার সহযোগী—মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন মাজার প্রাঙ্গণে পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, যার একটি বড় অংশ পার্সেন্টেজ হিসেবে সামুন ও খোকনের পকেটে যায়। এছাড়া মাজারের হেড বাবুর্চি সোহেল ও তার সহযোগী ফয়েজের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের চক্র সক্রিয়।

কোনো সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘চোর’ সাব্যস্ত করে মারধর করা হয় এবং পরে থানা-পুলিশের ভয় দেখিয়ে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। মানতের পশু রান্নার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফির চেয়ে ১০ গুণ বেশি টাকা আদায় করা হয় এবং মাংস, মাথা ও চামড়া গায়েব করে দেওয়া হয়। কসাইরা চামড়ার সাথে ১০-১৫ কেজি আস্ত মাংস রেখে দেন এবং একটি গরুর তিন ভাগের এক ভাগও রান্না করা হয় না। এমনকি ভক্তদের দেওয়া দামি গিলাফ ও গোলাপজল সরিয়ে নিয়ে তা পুনরায় সামনের দোকানে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।

​মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান অবশ্য দাবি করেন, মাজারের সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে সিসি ক্যামেরা লাগানো বা দানবাক্স সিলগালা করার মতো ‘যুদ্ধংদেহী মনোভাব’ অনভিপ্রেত। তিনি জানান, মাজারের নিজস্ব চৌকিদাররা সব সময় শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তিনি ১৩ জুলাই যোগদান করেছেন এবং মাজারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, বর্তমানে দুদকে কমিশন (চেয়ারম্যান ও কমিশনার) না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা সম্ভব হয়নি, তবে তারা অনানুষ্ঠানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং কমিশন গঠনের পর অনুমতি সাপেক্ষে অনুসন্ধান শুরু করা হবে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর