[email protected] রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

বাঁশখালীর ভয়াবহ বন্যা: মাটির ঘর বিলীন, ক্ষতির মুখে হাজারো পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬ ৯:১৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর এবারই সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে এলাকা। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাজারো বসতঘর, কৃষিজমি, মৎস্য খামার এবং লবণক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে ৫ হাজার ১১০টি বসতঘর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও প্রায় ৬ হাজার ঘর। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও অবকাঠামো মিলিয়ে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।


পানি সরে গেলেও দুর্ভোগ কাটেনি দুর্গত মানুষের। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাটির তৈরি ঘর ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা ভাঙা ঘরের পাশে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে। ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হওয়ায় নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামে নেমেছে তারা।


বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম চাঁপাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা নূরুল আলম জানান, তার পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে ছয়জনই জন্মান্ধ। বন্যার পানিতে তাদের একমাত্র মাটির ঘরটি ভেঙে যাওয়ায় এখন নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় দিন কাটছে।

তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরলেও থাকার মতো কোনো ঘর আর অবশিষ্ট নেই।
একই এলাকার বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, বন্যা তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি এলাকা পরিদর্শন করলেও স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানান তিনি।


বন্যার কারণে উপজেলার নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি ইউনিয়নে মোট ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিক নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন।


জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানান, ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন এবং নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে।


উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রায় ২৬ হাজার ৮০০ কৃষকের ৩ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। মৎস্য খাতে ৪ হাজার ২০০টি পুকুর ও ৩১০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।


বন্যায় উপজেলার ৫৮টি সড়ক, ৬০টি সেতু ও কালভার্ট এবং প্রায় ১০৯ কিলোমিটার সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খানখানাবাদ ও কাথারিয়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


এদিকে পানি কমে যাওয়ার পর নতুন করে সাপের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল পর্যন্ত সাপের কামড়ে ২২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।


চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল-নদী দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এবারের বন্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে জলকদর খাল ও গুনাগরী ছড়াসহ বিভিন্ন জলপথ দখল ও ভরাটের কারণে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয়নি।


উপকূলীয় এলাকার আশ্রয়কেন্দ্র নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উপজেলার ১২১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।


বাঁশখালীর সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, খাল দখল ও ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে খাল খনন ও অকেজো স্লুইস গেট সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্যার অন্যান্য কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গত মানুষের জন্য ইতোমধ্যে ১৭৫ মেট্রিক টন চাল, শুকনো ও রান্না করা খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, হাইজিন বক্স, জেরিকেন এবং খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর