রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে শুধু মানবিক সহায়তা নয় কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
তাদের মতে, প্রায় এক দশক ধরে চলমান সংকট মোকাবিলায় ত্রাণনির্ভর কার্যক্রম যথেষ্ট নয়; এখন প্রয়োজন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ।
বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে রোববার কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে।
‘কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম’ (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ২০২৬ সালের যৌথ সহায়তা পরিকল্পনা (জেআরপি) বাস্তবায়নে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার প্রয়োজন হলেও জুন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ ডলার।
অর্থায়নের ঘাটতির পাশাপাশি তহবিল বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অংশগ্রহণকারীরা।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা তহবিল থেকে বরাদ্দ হওয়া ১৫ কোটি ডলারের অধিকাংশই বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা পেয়েছে, আর বাকি অংশ আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় সংগঠনগুলো সরাসরি কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক মো. ইকবাল উদ্দিন বলেন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম করে তোলার কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে।
তিনি রোহিঙ্গা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওর সংজ্ঞা ও অংশগ্রহণের কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা শিবির ও আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধির কারণে পরিবেশগত ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে বলে সেমিনারে আলোচনা হয়।
আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাওয়া উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে নাফ নদীর পানি পরিশোধনসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অভিযোগ করেন, শিবিরকেন্দ্রিক মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
একই সঙ্গে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে বনভূমি ও পাহাড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মের পরিকল্পনা বা ‘জেআরপি ২.০’ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তাদের মতে, মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।
রোহিঙ্গা সমন্বয় প্ল্যাটফর্মের প্রধান ডেভিড বাগডেন বলেন, সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি মার্সেল গ্রোগান রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
সেমিনারে টেকনাফ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মর্জিনা আক্তার, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদসহ বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, আশ্রয়দাতা হিসেবে কক্সবাজারের মানুষ দীর্ঘ নয় বছর ধরে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ বহন করে আসছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো পরিকল্পনা কার্যকর হবে না বলেও তারা মত দেন।
সেমিনারের সঞ্চালক ও সিসিএনএফের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে তা কক্সবাজারের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও নানা ধরনের সামাজিক ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
এসআর