ম্যাটে লড়বেন দুই পুরুষ কুস্তিগির, আর সাইডলাইন থেকে তাঁদের রণকৌশল সাজাবেন বাংলাদেশের এক নারী—শিরিন সুলতানা। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বিষয়টি যেমন নজরকাড়া, তেমনি এর পেছনে রয়েছে একজন সাবেক অ্যাথলেটের দীর্ঘ লড়াই, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও কোচিংয়ের প্রস্তুতি।
জাপানের আইচি-নাগোয়ায় চলছে ২০তম এশিয়ান গেমস। বাংলাদেশের ১৮৭ জন ক্রীড়াবিদের মধ্যে ৯০ জন পুরুষ ও ৯৭ জন নারী। কোচ ও কর্মকর্তাদের মধ্যেও রয়েছেন ১২ জন নারী। বাংলাদেশ এবার মোট ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে কুস্তিও।
তবে বাংলাদেশের কুস্তি দলে আলাদা করে আলোচনায় এসেছেন শিরিন সুলতানা। কারণ, এবার তিনি কোচিং করাচ্ছেন পুরুষ জাতীয় কুস্তি দলকে।
নারী কোচ, পুরুষ কুস্তিগির—কেন শিরিন? প্রশ্নটি স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তরটাও পরিষ্কার—কোচের যোগ্যতা নির্ধারণে লিঙ্গ নয়, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই মূল বিষয়।
শিরিন নিজেই একসময় বাংলাদেশের হয়ে কুস্তির ম্যাটে লড়েছেন। ২০০৯ সালে কুস্তিতে তাঁর পথচলা শুরু। ২০১২ সালের ইন্দো-বাংলা রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৫ কেজিতে স্বর্ণ, ২০১৬ সালের এসএ গেমসে ৬৮ কেজিতে রৌপ্য এবং ২০১৭ সালের ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি। ২০১৮ গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে চতুর্থ হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন।
অর্থাৎ, যে খেলাটির কৌশল এখন তিনি শেখাচ্ছেন, সেই খেলায় তাঁর নিজেরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এমনকি ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিংয়ের রেকর্ডেও শিরিনের আন্তর্জাতিক কুস্তি ক্যারিয়ারের তথ্য রয়েছে। সেখানে তাঁকে বাংলাদেশের ৬৮ কেজি ওজন শ্রেণির নারী কুস্তিগির হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কোচ হিসেবেও নিয়েছেন প্রস্তুতি শিরিন। শিরিনের দায়িত্বটি শুধু সাবেক খেলোয়াড় হওয়ার কারণে নয়। তিনি Solidarity Coaches Course Level-2 সম্পন্ন করেছেন। ২০২৫ সালে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কুস্তি দলের প্রধান কোচ করার খবর প্রকাশিত হয়। তখন মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের ক্যাম্পে তিনি কুস্তিগিরদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।
সেই সময়ই বাংলাদেশের কুস্তিতে তিনি তৈরি করেন একটি নতুন দৃষ্টান্ত—জাতীয় কুস্তি দলের প্রথম নারী প্রধান কোচ।
২০২৬ এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতিতে শিরিনের অধীনে ছিলেন বাংলাদেশের দুই পুরুষ কুস্তিগির মাহবুব আলম ও আবদুস সাত্তার। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে তাঁদের দুজনকে শিরিনের শিষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে তিনজনের একসঙ্গে থাকার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।
তাঁদের একজন মাহবুব আলম কুমিল্লার দাউদকান্দির এবং আবদুস সাত্তার কুমিল্লার মেঘনার। দুজনই ঐতিহ্যবাহী মাটির কুস্তি থেকে উঠে এসেছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিংয়ের প্রকাশিত এন্ট্রি তালিকাতেও বাংলাদেশের Mahabub ALAM ও Abdul SATTAR-এর নাম রয়েছে। মাহবুব ৫৭ কেজি ফ্রিস্টাইল এবং সাত্তার ৬৫ কেজি ফ্রিস্টাইলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
শিরিনকে পুরুষ কুস্তিগিরদের কোচ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল—এ তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পুরুষ কুস্তিগিরের কোচ হিসেবে নারীকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে মাহবুব ও সাত্তার নিজেরাই বলেছেন, কোচ পুরুষ না নারী—সেটি তাঁদের কাছে মুখ্য নয়; শিরিনের খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পদক এবং কোচিং প্রশিক্ষণই তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
শিরিনের বক্তব্যও স্পষ্ট—তিনি কোচিংকে দেখছেন যোগ্যতা ও দায়িত্বের জায়গা থেকে।
তাঁর খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতা রয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, পদক জিতেছেন এবং কোচিং কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। ফলে পুরুষ কুস্তিগিরদের কোচ হওয়াকে তিনি লিঙ্গের প্রশ্ন হিসেবে নয়, যোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
এবারের এশিয়ান গেমসে কুস্তিতে ফ্রিস্টাইল, গ্রিকো-রোমান ও নারী কুস্তি—তিন ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং জানিয়েছে, ২০২৬ এশিয়ান গেমসে কুস্তিতে মোট ১৮টি ওজন শ্রেণি রয়েছে এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন ২৫৮ জন কুস্তিগির।
বাংলাদেশের নামও এবারের কুস্তি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। আর বাংলাদেশের পুরুষ কুস্তিতে এবার নজরের কেন্দ্রে দুই কুস্তিগির—মাহবুব আলম ও আবদুস সাত্তার, আর তাঁদের কোচ শিরিন সুলতানা।
তাহলে ইতিহাসটা কোথায়? ইতিহাসটা শুধু “পুরুষ দলের কোচ নারী”—এখানেই শেষ নয়।
একসময় শিরিন নিজে বাংলাদেশের হয়ে কুস্তির ম্যাটে লড়েছেন। আন্তর্জাতিক পদক জিতেছেন। এরপর খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিংয়ে এসেছেন। কোচিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়েছেন। আর এখন এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চগুলোর একটিতে বাংলাদেশের পুরুষ কুস্তিগিরদের কৌশল ও প্রস্তুতির দায়িত্বে দাঁড়িয়ে আছেন।
ম্যাটে প্রতিপক্ষ পুরুষ—কিন্তু কর্নারে নির্দেশনা দেবেন একজন নারী।
এটা শুধু আলোচনার বিষয় নয়; বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী নেতৃত্বের পরিধি যে ধীরে ধীরে খেলাধুলার বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হচ্ছে, শিরিন সুলতানার পথচলা তার একটি নথিভুক্ত উদাহরণ।
নারী না পুরুষ—সেটি নয়। ম্যাচের দিন আসল প্রশ্ন হবে, শিরিনের কৌশল কতটা কাজে লাগে।
এসআর