ব্রাজিলে ফিক্সড-অডস স্পোর্টস বেটিং বন্ধের সিদ্ধান্তে দেশটির ফুটবল অঙ্গনে আর্থিক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর ফলে ফিক্সড-অডস বেটিং পরিচালনা, প্রচার, মধ্যস্থতা ও বিজ্ঞাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তে বেটিং অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দেওয়াও বন্ধ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারকারীরা ৫ অক্টোবর পর্যন্ত নিজেদের জমা অর্থ তুলে নিতে পারবেন। নির্বাহী আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হলেও ১২০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে এর কার্যকারিতা থাকবে না বলে জানিয়েছে বিবিসি।
বেটিং বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রভাব ফুটবলেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটির কয়েকটি শীর্ষ ক্লাব। তাদের মতে, বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো স্পনসরশিপ প্রত্যাহার করলে ক্লাবগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়ের উৎস কমে যাবে। এতে আর্থিক সংকটে পড়তে পারে কিছু ক্লাব।
লুলা এই পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। সাও পাওলোতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, অনলাইন বেটিং নিয়ে ব্যাপক সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেটি মোকাবিলার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বেটিং শিল্পের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, এ খাত আসক্তিকে ব্যবসায়িক লাভে পরিণত করছে এবং পরিবারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে ফিক্সড-অডস বেটিংয়ের কিছু কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য একটি বিলও তৈরি করেছে লুলার সরকার। প্রস্তাবিত আইনে বেটিংয়ের প্রচার এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার বিষয়েও বিধিনিষেধ আনার কথা রয়েছে।
তবে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ব্রাজিলের কয়েকটি বড় ফুটবল ক্লাব। বিবিসির প্রতিবেদনে গ্রেমিওর বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনার পর থেকে খেলাধুলার অন্যতম বড় অর্থের উৎসে পরিণত হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আইন পরিবর্তনের ফলে অবৈধ বেটিংয়ের সুযোগ বাড়তে পারে এবং ফুটবল ক্লাবগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে গ্লোবোর তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের প্রধান ফুটবল ক্লাবগুলোকে বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন রিয়াল দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে অঙ্কটি আরও বড়। একই সময়ে দেশটির বেটিং শিল্পের মোট আয় ছিল প্রায় ৬২ দশমিক ৫ বিলিয়ন রিয়াল।
২০১৮ সালে ব্রাজিলে অনলাইন বেটিং বৈধ হওয়ার পর এ খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লুলা সরকার বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও করের আওতায় আনার জন্য আইন প্রণয়ন করে। পরবর্তী সময়ে অনিয়মের অভিযোগে দুই হাজারের বেশি অনলাইন বেটিং সাইট বন্ধ করা হয়।
বেটিং খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গার্ডিয়ানের উদ্ধৃত ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পোর্টস বেটিং থেকে ব্রাজিলে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়। ফলে এ খাতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বেটিং প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া খাতেও পড়তে পারে।
অন্যদিকে বেটিং ও জুয়ার সামাজিক ক্ষতির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বেটিং ও জুয়ার কারণে ব্রাজিলের সমাজে বছরে প্রায় ৩৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন রিয়ালের ব্যয় তৈরি হয়। এর সঙ্গে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার মতো গুরুতর সামাজিক সমস্যার সম্পর্ক থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, দেশটির নাগরিকেরা প্রতি মাসে প্রায় ৩০ বিলিয়ন রিয়াল বেটিংয়ে ব্যয় করেন। এর মধ্যে সরকারি নগদ সহায়তা কর্মসূচি ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র কিছু সুবিধাভোগীর ব্যয়ের তথ্যও ছিল। গত বছর তাদের বেটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বেটিং নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জনমতের একটি চিত্রও পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক জরিপে। বিবিসির প্রতিবেদনে অ্যাটলাস ও ব্লুমবার্গের চলতি সপ্তাহের জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ইন্টারনেট বেটিং নিষিদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
এসআর