[email protected] শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
২ শ্রাবণ ১৪৩৩

৩৯ বছর বয়সেও অতিমানবীয় মেসি: সব রেকর্ড ভেঙে আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ৮:৫৮ এএম

সংগৃহীত ছবি

২০০৬ সালের বিশ্বকাপে যখন লিওনেল মেসি প্রথম পা রাখেন, তখন আর্জেন্টিনা দলে

 রিকেলমে, তেভেজ, স্যাভিওলাদের মতো অনেক 'নতুন ম্যারাডোনা'র ভিড়। তবে খোদ দিয়েগো ম্যারাডোনা মেসিকে নিজের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করে সংশয় দূর করেছিলেন। ১৯ বছর বয়সী সেই তরুণ প্রথম বিশ্বকাপে মাত্র ৪০ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েই নিজের প্রতিভার জানান দেন। যদিও তৎকালীন কোচ হোসে পেকারমান জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে মাঠে নামাননি, যা নিয়ে আজও আক্ষেপ রয়ে গেছে।

​ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন ও সমালোচনার ঝড়

​ম্যারাডোনা পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার কোচ হয়েও মেসিকে বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি, এমনকি একপর্যায়ে মেসির নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে ২৯ বছর বয়সের মধ্যেই ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ৫টি ব্যালন ডি’অর জিতে মেসি নিজেকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যান। ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে দল হারলেও দুটিতেই তিনি টুর্নামেন্ট সেরা হন।

​জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না থাকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ২০১৬ ইউরো জয় মেসিকে কিছুটা পিছিয়ে দেয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ৩৫ বছর বয়সে পৌঁছানো মেসির পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। ক্লাবেও বার্সেলোনার হয়ে ২০১৫ সালের পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জেতায় সমালোচনা তীব্র হতে থাকে।

​স্কালোনির আগমন ও মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন

​২০২১ সালে দৃশ্যপট বদলে যায় কোচ লিওনেল স্কালোনির হাত ধরে। মেসিকে কেন্দ্র করে দল সাজিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে ২৮ বছর পর কোপা আমেরিকা এবং পরে ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমা জেতান।

​এরপর আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারলেও মেসির নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় দল। পুরো টুর্নামেন্টে ৭টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানান মেসি। এই সাফল্যের পর তিনি ইউরোপ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) দল ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেন এবং সেখানেও ট্রফি জেতেন।

​২০২৬ বিশ্বকাপে রেকর্ডের নতুন দিগন্ত

​৩৯ বছর বয়সে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে যখন মেসি খেলতে আসেন, তখন অনেকেই তার ফর্ম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে মাঠে নেমে সব সংশয় উড়িয়ে দিয়েছেন এই মহাতারকা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে গোল করে তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডদের সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শামিল হন।

​নকআউট পর্বেও তার জাদুকরী পারফরম্যান্স অব্যাহত থাকে। কেপ ভার্দ ও মিশরের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করার পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড নিজের করে নেন। সবশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দল যখন বিদায়ের মুখে, তখন শেষ ১০ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজকে দিয়ে জোড়া গোল করিয়ে প্রায় একাই দলকে ফাইনালে তোলেন।

​পেলে, ম্যারাডোনা ও রোনালদোকে ছাড়িয়ে অনন্য উচ্চতায়

​ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ব্যালন ডি’অর ও আন্তর্জাতিক ট্রফিতে আগেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের কীর্তিকেও স্পর্শ করেন। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে পেলের তিনবার বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ডের কাছাকাছি না গেলেও, ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে তোলার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন মেসি।

​চলতি আসরে ইতিমধ্যে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করা মেসি এবারও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার (গোল্ডেন বল) জেতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। প্রায় শতবর্ষ ছুঁইছুঁই বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩৯ বছর বয়সে এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স আর কেউ দেখাতে পারেনি। তাই ফুটবল দুনিয়ায় এখন একটাই বড় সত্য— 'মেসিই ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার', এই বাক্যটি থেকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে নেওয়ার সময় এখন চলে এসেছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর