চার জাতির ডায়মন্ড জুবিলি টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে বাংলাদেশ অলিম্পিক ফুটবল দল।
সুযোগ নষ্টের মাশুল, পাকিস্তানের বিপক্ষে হতাশার ড্র বাংলাদেশের চার জাতির ডায়মন্ড জুবিলি টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে বাংলাদেশ অলিম্পিক ফুটবল দল। স্কোরলাইন বলছে ম্যাচটি সমতায় শেষ হয়েছে, কিন্তু পুরো ৯০ মিনিটের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের জন্য হারানো দুই পয়েন্টের গল্প। বিশেষ করে একের পর এক সুযোগ নষ্ট, আক্রমণে কার্যকারিতার অভাব এবং শেষ তৃতীয়াংশে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে জয় নিয়েও মাঠ ছাড়তে পারেনি লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
মালদ্বীপের মালে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই ইতিবাচক ফুটবল খেলার ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন সৌরভ দেওয়ান। ডান প্রান্ত থেকে আসা ক্রস পেয়ে তিনি গোলমুখে শট নিলেও বল লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। ম্যাচের শুরুতেই এমন সুযোগ নষ্ট হওয়া পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্য বড় আফসোস হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমার্ধের অধিকাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের কাছে। মাঝমাঠে আধিপত্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সমস্যা ছিল শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে। প্রতিপক্ষের বক্সের কাছাকাছি গিয়েও আক্রমণগুলো বারবার থেমে গেছে ভুল পাস, দুর্বল শট কিংবা সমন্বয়ের অভাবে। মাঠে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও স্পষ্ট ছিল।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে মুরশেদ আলী ম্যাচের অন্যতম সেরা সুযোগটি নষ্ট করেন। গোলরক্ষকের সঙ্গে প্রায় একা হয়ে গিয়েও তিনি বল জালে জড়াতে পারেননি। এমন সুযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজে লাগাতে না পারলে ম্যাচ জেতা কঠিন—এ কথাই যেন আবারও প্রমাণ করল বাংলাদেশ।
বিরতির আগে পেনাল্টির দাবিও তোলে বাংলাদেশ। তবে ম্যাচ কর্মকর্তা তাতে সাড়া দেননি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের আড়ালে বাংলাদেশের আক্রমণভাগের ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে না। কারণ সুযোগ তৈরি হলেও সেগুলোকে গোলে রূপ দেওয়ার সামর্থ্য দল দেখাতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে হাতছাড়া হতে শুরু করে। পাকিস্তান আক্রমণের গতি বাড়ালে বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার চাপে পড়তে হয়। ৬১ মিনিটে পাকিস্তানের এক ডিফেন্ডার প্রথমে লাল কার্ড দেখলেও পরে তা হলুদ কার্ডে পরিবর্তন করা হয়। ওই মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারত। কিন্তু সেই পরিস্থিতিকেও নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর মতো দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ।
বরং ম্যাচ যত এগিয়েছে, পাকিস্তান তত বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণে বাংলাদেশের গোলপোস্ট কাঁপিয়ে দেয় তারা। এ সময় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হন গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণ। তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ না থাকলে ম্যাচের ফল ভিন্নও হতে পারত।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে পাকিস্তানের আক্রমণগুলো বাংলাদেশের রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। মাঝমাঠ থেকে রক্ষণে ফেরার গতি, ডিফেন্সিভ সংগঠন এবং বল হারানোর পর দ্রুত পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। এসব বিষয় ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোর আগে কোচিং স্টাফকে অবশ্যই ভাবাবে।
ম্যাচের শেষ দিকে বাংলাদেশের খেলায় পরিকল্পনার অভাবও চোখে পড়ে। আক্রমণে ওঠার পর সঠিক পাসিং, ফিনিশিং এবং সমন্বয়ের সংকট বারবার দেখা গেছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার মতো সৃজনশীলতা খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত গোলটি পাওয়া যায়নি।
ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশ একটি পয়েন্ট পেলেও পারফরম্যান্সের বিচারে সন্তুষ্ট হওয়ার খুব বেশি কারণ নেই। কারণ ম্যাচের শুরুতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ছিল, এমনকি বেশ কয়েকটি আক্রমণও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গোল করার অক্ষমতা আবারও বড় সমস্যা হয়ে সামনে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, এই ম্যাচে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হতাশা আক্রমণভাগের ব্যর্থতা। সুযোগ তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো কাজে লাগানো আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গাতেই পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে জয়ের সম্ভাবনা থাকা ম্যাচে ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে দলকে।
এসআর