[email protected] শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
৪ মাঘ ১৪৩২

নবী যুগে মসজিদ যেভাবে মুসলিম সমাজের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৮ এএম

মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যান। তবে ইসলামের

 সূচনালগ্নে মসজিদের ভূমিকা শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং নবী করিম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে মসজিদ ছিল মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র। আধুনিক পরিভাষায় বলা যায়, মসজিদই ছিল তখনকার পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি সেন্টার। ইসলামি চিন্তাবিদ ড. জাসের আওদা মনে করেন, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে মসজিদের সেই বহুমাত্রিক ভূমিকা আবারও সচল করতে হবে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মদিনার মসজিদে নববী নবী যুগে বহুবিধ কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। সেখানে ইবাদতের পাশাপাশি সমাজ পরিচালনা, শিক্ষা, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হতো।
নবী যুগে মুসলিম সমাজে মসজিদের সাতটি প্রধান ভূমিকা ছিল—


১. নামাজ আদায়ের উন্মুক্ত স্থান


মসজিদে নববী ছিল পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায়ের কেন্দ্র। সেখানে পুরুষ ও নারী, শিশু ও বৃদ্ধ, আরব ও অনারব—সবার জন্য প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত ছিল। নারীরা আলাদা কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, নারীদের মসজিদে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না। অথচ আজ অনেক স্থানে নারীদের জন্য অপ্রতুল ব্যবস্থা রাখা হয় বা শিশুদের মসজিদে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করা হয়, যা নবীজির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


২. সামাজিক যোগাযোগ ও খোঁজখবরের কেন্দ্র


নবী করিম (সা.) মসজিদকে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। কোনো সাহাবিকে কয়েক দিন মসজিদে দেখা না গেলে তিনি তার খোঁজ নিতেন, অসুস্থ হলে দেখতে যেতেন এবং প্রয়োজনে সাহায্যের ব্যবস্থা করতেন।


৩. দাওয়াত ও জ্ঞান আহরণের স্থান


ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহীরা সরাসরি মসজিদে এসে প্রশ্ন করতেন। অমুসলিমদেরও মসজিদে প্রবেশে বাধা দেওয়া হতো না। নবী যুগে মসজিদ ছিল ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।


৪. আনন্দ ও সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্র


নবী করিম (সা.) বিয়ের খবর প্রচার ও সামাজিক আনন্দ প্রকাশের জন্য মসজিদে আয়োজন করার কথা বলেছেন। ঈদের দিনগুলোতেও মসজিদে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার আফ্রিকান মুসলমানরা মসজিদের ভেতরে ক্রীড়া প্রদর্শনী করেছিল এবং তিনি নবীজির পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখেছিলেন।


৫. আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান


রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনা হতো মসজিদেই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত সেখানেই গৃহীত হয়েছে।


৬. চিকিৎসা ও সেবার কেন্দ্র


ইসলামী সভ্যতায় প্রাতিষ্ঠানিক হাসপাতাল গড়ে ওঠার আগে আহত ও অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষার কাজও মসজিদে নববীতেই সম্পন্ন হতো, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়।


৭. শিক্ষার কেন্দ্র


মসজিদ ছিল শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। অনেক সাহাবি এখানেই পড়া-লেখা শিখেছেন। পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধ জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার ভিত্তিও গড়ে উঠেছে এই মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে।
ড. জাসের আওদা উল্লেখ করেন, মসজিদে একটি কাজই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল—তা হলো কেনাবেচা ও বাণিজ্যিক লেনদেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে মসজিদকে পার্থিব লাভের জায়গা বানাতে নিষেধ করেছেন।
সব মিলিয়ে নবী যুগে মসজিদ ছিল একটি জীবন্ত সমাজকেন্দ্র—যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, মানবসেবা, আলোচনা, আনন্দ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা হতো। সেই আদর্শে ফিরে যাওয়াই আজকের মুসলিম সমাজ পুনর্গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর