[email protected] শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
৪ মাঘ ১৪৩২

মহানবীকে (সা.) বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল যে সুরায়

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩১ এএম

পবিত্র কোরআনের সুরা নাসর আয়াতসংখ্যায় খুবই সংক্ষিপ্ত—মাত্র

তিনটি আয়াত। কিন্তু এর অর্থ ও তাৎপর্য ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ।

এই সুরার মধ্যে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতি জীবনের পরিপূর্ণতা, ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা এবং বিজয়ের পর একজন মুমিনের করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

তাফসিরকারদের মতে, এটি শুধু মক্কা বিজয়ের পূর্বাভাসই নয়, বরং রাসুলুল্লাহর (সা.) পার্থিব দায়িত্বের সমাপ্তির দিকেও ইঙ্গিত বহন করে।


সুরা নাসর মদিনায় অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈসহ বহু আলেমের অভিমত হলো—এটি কোরআনে নাজিল হওয়া শেষদিকের সুরাগুলোর একটি। আয়াত কম হলেও এর তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক।

এতে একদিকে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিজয়ের ঘোষণা রয়েছে, অন্যদিকে এমন একটি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যা দেখে নবীজি (সা.) বুঝে নেবেন যে তার দুনিয়ার দায়িত্ব শেষের পথে।


ইমাম ইবনে কাসির ও অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেন, সুরা নাসর মূলত রাসুলুল্লাহর (সা.) ওফাতের নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ বহন করে।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে যখন এই সুরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি বলেন—এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রাসুলকে জানিয়ে দেওয়া যে তার ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। এই বক্তব্য সহিহ বুখারিতেও বর্ণিত হয়েছে।


আরেক বর্ণনায় জানা যায়, জীবনের শেষ দিকে নবীজি (সা.) নিয়মিত একটি দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতেন—
“সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমি তার কাছে ক্ষমা চাই এবং তার কাছেই তাওবা করি।”


তিনি বলতেন, আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে আমার উম্মতের মধ্যে আমি একটি নির্দিষ্ট নিদর্শন দেখতে পাব। যখন সেই নিদর্শন প্রকাশ পাবে, তখন যেন আমি আল্লাহর প্রশংসা করি, তার পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং তার কাছে ক্ষমা চাই।


এরপর তিনি সুরা নাসরের আয়াত তিলাওয়াত করতেন—
যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, আর মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করবে, তখন তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।


মক্কা বিজয়ের ইঙ্গিত
আলেমদের মতে, এই সুরায় যে বিজয়ের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মক্কা বিজয়কেই নির্দেশ করে। মক্কা বিজয়ের আগে আরবের বহু গোত্র ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে দ্বিধায় ছিল। তারা ধারণা করত—যদি মুহাম্মদ (সা.) নিজের কওমের ওপর বিজয়ী হন, তবে তিনি অবশ্যই সত্য নবী।


পরবর্তীতে যখন মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়, তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।


এইভাবে সুরা নাসর একদিকে ইসলামের বিশাল বিজয়ের সুসংবাদ দেয়, অন্যদিকে নবী মুহাম্মদকে (সা.) জানিয়ে দেয় যে তার পার্থিব দায়িত্ব প্রায় শেষের পথে।


বিজয়ের পর করণীয় কী?
এই সুরায় বিজয়ের পর নবীজি (সা.)-কে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—অহংকার নয়, বরং আল্লাহর প্রশংসা, তার পবিত্রতা ঘোষণা এবং ক্ষমা প্রার্থনা।


এই আয়াতগুলো শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তিনি যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা বিজয় দান করেন। নবী ও মুমিনরা কেবল সেই মহান পরিকল্পনার অংশ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।


বিজয়ের মুহূর্তে মানুষের মনে অহংকার, আত্মতৃপ্তি কিংবা অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আবার দীর্ঘ সংগ্রামের সময় হতাশা ও দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। এসব কারণেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি।


ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এবং মনে রাখে—সে নিখুঁত নয়, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়।
নবীজি (সা.) নিজেই এই শিক্ষার বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি মাথা নত করে, বিনয়ের সঙ্গে উটে আরোহন করে নগরে প্রবেশ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ভুলে গিয়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন তাসবিহ, তাহমিদ ও ইস্তেগফারে।

আল্লাহ যখন কাউকে বিজয় দান করেন—হোক তা বিপদ থেকে মুক্তি, অন্যায়ের প্রতিকার, সম্মান পুনরুদ্ধার কিংবা জীবনের কোনো বড় সাফল্য—তখন করণীয় একটাই: আল্লাহর প্রশংসা করা, তার মহিমা ঘোষণা করা এবং নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া।


কারণ সম্মান ও পরীক্ষা—উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনিই সবকিছুর মালিক ও পরিচালনাকারী।


বিজয়ে অহংকার নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও বিনয়—এই শিক্ষাই সুরা নাসরের মূল বার্তা।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর