ইমান কেবল নামাজ, রোজা বা মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
একজন মানুষের বিশ্বাসের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় তার পারিবারিক জীবন, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও দাম্পত্য সম্পর্কে। বিশেষ করে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক যদি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটিই হয়ে ওঠে ইমানের বাস্তব প্রতিফলন। একজন নেককার স্ত্রী যেমন সংসারকে সুন্দর করে তোলেন, তেমনি স্বামীর আখিরাতের পথ সহজ করতেও ভূমিকা রাখেন।
‘আমার স্ত্রী আমার ইমানের অর্ধেক’— কথাটির উৎস কী?
ইসলামি সাহিত্য ও মনীষীদের জীবনীতে ইমাম শাফি (রহ.)-এর নামে একটি উক্তি পাওয়া যায়— “আমার স্ত্রী আমার ইমানের অর্ধেক।” এই বক্তব্যটি সরাসরি কোনো হাদিস নয়। বরং এটি দাম্পত্য জীবনের গুরুত্ব বোঝাতে মনীষীদের ব্যক্তিগত উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। (মিন হায়াতি শাফি: সাঈদ বিন আলী আল-কাহতানি)
ইমাম শাফি (রহ.) তার স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। পারিবারিক জীবনে কোনো ভুল হলে নিজ থেকেই ক্ষমা চাইতেন। এই আচরণ প্রমাণ করে, ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ককে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসলামে বিবাহ কেন ইমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত
ইসলামে বিবাহ কেবল সামাজিক চুক্তি নয়; বরং এটি একটি ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবসমাজকে বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন—
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা এটি দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
(বুখারি: ৫০৬৬, মুসলিম: ১৪০০)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, বিবাহ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে— যা ইমান সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান উপাদান।
কুরআনের আলোকে স্বামী–স্ত্রীর বন্ধন
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি ও রহমতের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন—
“আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে— তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তোমাদের মাঝে স্থাপন করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।”
(সুরা আর-রূম: ২১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, স্ত্রী কেবল পার্থিব সুখের মাধ্যম নন; বরং ইমানের স্থিতি ও মানসিক প্রশান্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত।
নেককার স্ত্রী কেন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“দুনিয়া ভোগের বস্তু, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।”
(মুসলিম: ১৪৬৭)
একজন নেককার স্ত্রী—
স্বামীকে গুনাহ থেকে দূরে রাখেন
ইবাদত ও দ্বীনি কাজে সহায়তা করেন
সন্তানদের ইমানদার হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন
এই কারণেই বলা হয়, একজন স্ত্রী স্বামীর ইমান পূর্ণতার পথে বড় সহায়ক শক্তি।
স্ত্রীর প্রতি আচরণই ইমানের মানদণ্ড
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
(তিরমিজি: ৩৮৯৫)
স্ত্রীর প্রতি ধৈর্য, সম্মান ও সহানুভূতি দেখানো ইমানের পরিপক্বতার পরিচায়ক। ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রী কোনো বোঝা নন কিংবা অধীনস্থ নন; বরং তিনি স্বামীর জীবনের সঙ্গী— দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই।
উপসংহার
“স্ত্রী স্বামীর ইমানের অর্ধেক”— এই বাক্যটি হুবহু হাদিস না হলেও এর মর্মার্থ কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত। স্ত্রীকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তার হক আদায় করা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং তা ইমানের বাস্তব প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের দাম্পত্য জীবনকে ভালোবাসা, রহমত ও ইমানের পূর্ণতায় ভরিয়ে দিন। আমিন।
এসআর
মন্তব্য করুন: