একই বিদ্যালয়, একই শ্রেণিকক্ষ, একই বেঞ্চ—তবু প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের নতুন করে ‘ভর্তি’ হতে হচ্ছে।
বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ভর্তি ফি, সেশন চার্জ ও নানা নামে অতিরিক্ত অর্থ।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থায় এটি এখন আর ব্যতিক্রম নয়—বরং নিয়মিত একটি আদায় প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
দেশজুড়ে বেসরকারি কেজি স্কুল থেকে শুরু করে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি বছর পুনঃভর্তির নামে গড়ে হাজার হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। হিসাব করলে বার্ষিক এই আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষাবর্ষ শেষে একই প্রতিষ্ঠানে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সময় শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভর্তি ফি দিতে বাধ্য করা হয়।
কোথাও ২ হাজার টাকা, কোথাও ৫ হাজার, আবার রাজধানীর কিছু স্কুলে এই অঙ্ক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। সরকারি ফি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
এক অভিভাবক জানান, তাঁর সন্তান একই স্কুলে পড়লেও নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ফরম, সেশন চার্জ ও অন্যান্য খাতে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। লিখিত কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি, প্রশ্ন তুললে সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে শঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০২০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘এক বিদ্যালয়ে একবারই ভর্তি ফি’ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। তবে কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও নীতিমালাটি কার্যকর হয়নি। ফলে আগের মতোই চলতে থাকে পুনঃভর্তির নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাগজে পুনঃভর্তি ফি নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে তা বিভিন্ন নামে আদায় করা হচ্ছে। ফরম পূরণ, সেশন চার্জ বা উন্নয়ন ফি—নাম আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক।
এই বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মাহবুবুল আলম বলেন,
“একজন শিক্ষার্থী যদি একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে পড়ে, তাহলে তাকে বারবার ভর্তি করানোর কোনো একাডেমিক বা প্রশাসনিক যুক্তি নেই।
পুনঃভর্তি ফি মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দুর্বল জায়গাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা আর্থিক কৌশল। এটি বন্ধ না হলে শিক্ষাকে সামাজিক অধিকার নয়, বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের ঝুঁকি বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়নের নজরদারি না থাকায় সমস্যাটি জিইয়ে আছে। অভিভাবকদের ভয়ের সুযোগ নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর এই অর্থ আদায় করে যাচ্ছে।
অভিভাবকদের দাবি, অবিলম্বে ‘এক বিদ্যালয়ে একবারই ভর্তি ফি’ নীতিমালা কার্যকর করতে হবে।
পাশাপাশি পুনঃভর্তির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
তাঁদের মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বন্ধ হবে না। আর শিক্ষা—যা মানুষের মৌলিক অধিকার—তা ধীরে ধীরে সবচেয়ে লাভজনক কিন্তু সবচেয়ে বৈষম্যমূলক খাতে পরিণত হতে থাকবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: