শীত এলেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা রসের কথা মনে পড়ে।
এই পানীয় শুধু মৌসুমি খাদ্য নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থেকে শহরে খেজুর রসের চাহিদা বেড়েছে, আর সেই সুযোগে অনলাইনে তৈরি হয়েছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্য।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কাঁচা খেজুর রস ‘খাঁটি’, ‘নিরাপদ’ ও ‘প্রাকৃতিক’ বলে প্রচার করে বিক্রি করা হচ্ছে। ঢাকা ছাড়াও যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলার নাম ব্যবহার করে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বিক্রেতারা দাবি করছেন, বাদুড় ও পাখির সংস্পর্শ এড়াতে গাছে জাল ব্যবহার করা হয় এবং রস সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত।
কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। কাঁচা খেজুর রস নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের একটি পরিচিত মাধ্যম। এই ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং এখনো এর নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। বাংলাদেশে গত দুই দশকের বেশি সময়ে শতাধিক মানুষ নিপাহে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ মারা গেছেন। সর্বশেষ বছরেও আক্রান্তদের কেউই বেঁচে থাকতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রস সংগ্রহের পর ফ্রিজে রাখা হলেও নিপাহ ভাইরাস ধ্বংস হয় না। সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার কোনো উপায় নেই—কোন রস নিরাপদ আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অনলাইনে বা সরাসরি কেনা কাঁচা রস পান করা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।
রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাঁচা খেজুর রস পান করা অনেকটাই অদৃশ্য ঝুঁকি নিয়ে চলার মতো।
সবাই আক্রান্ত না হলেও যাঁরা সংক্রমিত হন, তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তাই রস অবশ্যই ফুটিয়ে পান করা বা গুড় ও পিঠা তৈরিতে ব্যবহার করাই নিরাপদ পদ্ধতি।
সরকারি সংস্থা ও গবেষকেরা বারবার সতর্ক করলেও অনলাইনে কাঁচা খেজুর রসের অবাধ বিক্রি এখনো বন্ধ হয়নি। এ অবস্থায় জনসচেতনতা বাড়ানো এবং অনিরাপদ বিক্রির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
খেজুর রসের ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে সেটিকে নিরাপদভাবে গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এসআর
মন্তব্য করুন: