আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও জাতীয় জীবনে একটি অতুলনীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ সময়ের বিরোধী নেতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক দৃঢ় প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে জাতীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর প্রস্থানে দেশজুড়ে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হচ্ছে। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং আগামীকাল (৩১ ডিসেম্বর) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকাল একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন রাষ্ট্রনায়ক—যাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়, বরং গণতন্ত্র, আত্মমর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারের জন্য এক দীর্ঘ, কঠিন ও অবিচল সংগ্রামের দলিল।
তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হারালো এমন এক নেতৃত্বকে, যিনি প্রতিকূলতার মুখেও আপসকে বেছে নেননি, নীরবতাকে মেনে নেননি, বরং সংগ্রামকেই নিজের পথ করে নিয়েছিলেন।

নীরবতা ভেঙে নেতৃত্বে: এক অনিবার্য উত্থান: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক, কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব ছিল পরিকল্পিত, সংহত ও সময়োপযোগী। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা সহজ ছিল না। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং খুব অল্প সময়েই নিজেকে প্রমাণ করেন একজন দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী নেত্রী হিসেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস। তিনি কারও ছায়ায় রাজনীতি করেননি; বরং নিজস্ব অবস্থান ও দর্শন দিয়েই নেতৃত্ব দিয়েছেন।
.jpg)
নব্বইয়ের গণআন্দোলন: ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নেতৃত্ব: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এক অনিবার্য অধ্যায়। স্বৈরাচারবিরোধী সেই আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রাজপথে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি, রাজনৈতিক ঐক্য গঠনে অগ্রণী ভূমিকা এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান—এই সবকিছু মিলেই স্বৈরাচার পতনের পথ সুগম হয়।
এই আন্দোলন ছিল কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের সংগ্রাম—যেখানে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ।
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত: ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়া যে সিদ্ধান্ত নেন, তা তাঁকে একজন সাধারণ রাজনৈতিক নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়কের উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং সংবিধান ও সংসদের শক্তিশালীকরণই রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পথ। এই সিদ্ধান্ত আজও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
আপোষহীন নেতৃত্ব: অন্যায়ের সঙ্গে কখনো সমঝোতা নয়: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর আপোষহীনতা। রাজনৈতিক সুবিধা, সাময়িক স্বস্তি কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—কোনো কিছুর বিনিময়েই তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেননি। এই আপোষহীনতাই তাঁকে বহুবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে করেছে একটি নৈতিক উচ্চতার প্রতীক।
ওয়ান–ইলেভেন: গণতন্ত্রের অন্ধকার সময়ে এক অনড় কণ্ঠ: ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। জরুরি অবস্থা, মৌলিক অধিকার সীমিতকরণ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সেই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্টভাবে সাংবিধানিক ধারার পক্ষে অবস্থান নেন। রাজনৈতিক গবেষণা ও স্মৃতিকথায় উল্লেখ আছে—এই সময় তাঁর দৃঢ় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে আবার নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার নৈতিক ভিত্তি জোগায়।
.jpg)
বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক নিপীড়নের অধ্যায়: বেগম খালেদা জিয়ার এক সাহসী সংগ্রাম: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনো কোনো রাজনৈতিক নেতার জীবন সহজ পথ পায় না। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন এক বিস্ময়কর অধ্যায়, যেখানে আপোষহীন নেতৃত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার উদাহরণ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও বেদনাদায়ক—যেখানে তিনি আইনি জটিলতা, কারাবাস এবং গুরুতর অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হন।
বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা ও বিচারিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই সময়কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সংবেদনশীল ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল—যার লক্ষ্য ছিল একজন নির্ভীক, আপোষহীন নেত্রীকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা।
তবুও, বেগম খালেদা জিয়ার আইনের প্রতি অটল শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তাঁকে অপরাজেয় রাখে। তিনি জানতেন, তার উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হবে। তারপরও তিনি আইনের নিয়ম মেনে চলেছেন এবং নিজের কার্যক্রম নিয়মিত ও সচেতনভাবে চালিয়ে গেছেন। এই অদম্য মনোবল তাঁকে রাজনৈতিক অনুশীলনে এক অনন্য ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক বানিয়েছে।
কারাবাসের কঠিন দিনগুলোতে, গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও তিনি নিজের দৃঢ় মনোবল ও নৈতিক দৃঢ়তা হারাননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই সময়ের ধৈর্য ও সহনশীলতা বেগম খালেদা জিয়াকে শুধু একজন শক্তিশালী নেত্রী হিসেবেই নয়, বরং ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক নেতৃত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ সময়কালের ঘটনাবলী বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও যথাযথভাবে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে:
ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো জানিয়েছে, আদালতের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যেও তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যেসব চাপের সম্মুখীন হন, তাতে তিনি কোনো আপোষ করেননি।
বিএসএস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কারাবাসের সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও উল্লেখ করেছে, বেগম খালেদা জিয়ার এই অধ্যায় একজন রাজনৈতিক নেতার নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব পালনের জীবন্ত উদাহরণ।
বিগত সরকারের এই সময়কালের চ্যালেঞ্জগুলো তাঁর নেতৃত্বকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং এই সকল প্রতিকূলতা তাঁকে আরও সংযমী, সহনশীল ও নৈতিকভাবে দৃঢ় করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিহিংসা কখনো আপোষহীন নেতৃত্ব ও নৈতিকতার মানকে কমাতে পারে না।

আজ, এই অধ্যায়ের আলোকে আমরা বেগম খালেদা জিয়াকে কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন সাহসী, ন্যায়পরায়ণ ও আপোষহীন নেত্রী হিসেবে স্মরণ করি, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং ন্যায়বিচারের জন্য অটল থাকেন।
দেশপ্রেমের অমর উচ্চারণ : বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য—“বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই; বাংলাদেশেই আমার একমাত্র ঠিকানা।”
এই এক বাক্যেই ধরা পড়ে তাঁর দেশপ্রেম, আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক দর্শন। ক্ষমতার বাইরে গিয়েও তিনি দেশ ছাড়ার কথা ভাবেননি—কারণ তাঁর রাজনীতি ছিল এই মাটির মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
ইতিহাসে তাঁর স্থান: বেগম খালেদা জিয়াকে মূল্যায়ন করতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হননি। বিতর্ক, সমালোচনা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় তাঁর অবদান ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।
শেষ শ্রদ্ধা: বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রামের, সাহসের ও আপোষহীনতার। তাঁর প্রয়াণে একটি যুগের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং দেশপ্রেম—বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: