ডাল বাঙালির নিত্যদিনের খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মসুর, মুগ, ছোলা বা আরহর—যে ডালই হোক না কেন, সবগুলোই পুষ্টিতে সমৃদ্ধ। তবে ডাল রান্না করতে গেলে একটি বিষয় প্রায় সবার চোখেই পড়ে—ফুটতে শুরু করলে ওপরের দিকে হালকা সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের ফেনার মতো আস্তরণ জমে ওঠে। অনেকেই মনে করেন, এই ফেনা শরীরের জন্য ক্ষতিকর বা বিষাক্ত। তাই রান্নার শুরুতেই সেটি তুলে ফেলে দেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।
ডাল রান্নার সময় ফেনা ওঠে কেন
ডাল সেদ্ধ করার সময় যে ফেনা দেখা যায়, তা একেবারেই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক একটি প্রক্রিয়ার ফল। ডালের ভেতরে থাকা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও স্টার্চ গরম পানির সংস্পর্শে এলে তাদের গঠন পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে বাতাস আটকে গিয়ে ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি হয়, যা ওপরের দিকে উঠে ফেনার মতো দেখায়। একই সঙ্গে ডালের গায়ে থাকা আলগা স্টার্চ পানিতে মিশে এই ফেনাকে আরও ঘন করে তোলে। অর্থাৎ, এই ফেনা ডালের বাইরের কোনো ক্ষতিকর বস্তু নয়, বরং ডালেরই অংশ।
ফেনা কি আদৌ ক্ষতিকর
রায়পুরের অনকোলজিস্ট ডা. জয়েশ শর্মার মতে, ডালের ফেনাকে ‘বিষ’ মনে করা একটি ভুল ধারণা। এই ফেনার মধ্যে মূলত থাকে স্যাপোনিন নামের একটি যৌগ, যা উদ্ভিদের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা উপাদান। অল্প পরিমাণে স্যাপোনিন শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়; বরং এটি প্রদাহ কমাতে ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তবে অতিরিক্ত পরিমাণে এই ফেনা খাওয়া হলে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এতে ডালের স্বাদ কিছুটা তেতো লাগতে পারে এবং যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের আস্তরণে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। বিশেষ করে আইবিএস (IBS) সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এটি কিছুটা বিরক্তিকর হতে পারে।
ডাল খেলে পেট ফাঁপা বা গ্যাস হয় কেন
ডাল খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা ভারী লাগার জন্য সাধারণত ফেনাকে দায়ী করা হলেও চিকিৎসকদের মতে, এর মূল কারণ অন্য জায়গায়। এই সমস্যার প্রধান কারণ হলো ফডম্যাপস (FODMAPs) নামের কিছু বিশেষ ধরনের কার্বোহাইড্রেট।
ফডম্যাপস এমন স্বল্প-শৃঙ্খলযুক্ত কার্বোহাইড্রেট, যা আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম হয় না। এগুলো বড় অন্ত্রে পৌঁছে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে, ফলে গ্যাস তৈরি হয় এবং পেটে অস্বস্তি দেখা দেয়।
FODMAPs-এর পূর্ণরূপ হলো—
ফারমেন্টেবল
অলিগোস্যাকারাইড (যেমন ফ্রুকটান ও গ্যালাক্টো-অলিগোস্যাকারাইড)
ডাইস্যাকারাইড (যেমন ল্যাকটোজ)
মনোস্যাকারাইড (অতিরিক্ত ফ্রুকটোজ)
পলিওল (যেমন সোরবিটল ও ম্যানিটল)
ডালে প্রাকৃতিকভাবেই গ্যালাক্টো-অলিগোস্যাকারাইড থাকে। এ কারণেই অনেকের জন্য ডাল হজম করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে যায়।
ডাল সহজে হজম করার উপায়
শুধু ডালের ওপরের ফেনা তুলে ফেলাই সমস্যার সমাধান নয়। বরং ডাল সঠিকভাবে প্রস্তুত করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার আগে ডাল ভালোভাবে ধুয়ে কিছু সময় ভিজিয়ে রাখলে এর ভেতরের কিছু স্বল্প-শৃঙ্খলযুক্ত কার্বোহাইড্রেট পানিতে বেরিয়ে আসে। সেই পানি ফেলে দিলে গ্যাস ও পেট ফাঁপার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। পাশাপাশি এতে ধুলো, ময়লা ও অতিরিক্ত স্টার্চও দূর হয়।
প্রেসার কুকারে ডাল রান্না করলে
উচ্চ তাপমাত্রায় ডালের আঁশ ও প্রোটিন ভালোভাবে নরম হয়। এতে স্যাপোনিন ও হজমে সমস্যা সৃষ্টি করা উপাদানগুলো ভেঙে যায়। ফলে ডাল সহজে হজম হয়, হালকা লাগে এবং পুষ্টিগুণও তুলনামূলকভাবে বেশি বজায় থাকে।
ডাল খেয়ে পেট ভারী লাগলে
সবসময় দোষ ডালের নয়, অনেক সময় দোষ আমাদের রান্নার পদ্ধতির। মাত্র ২০ থেকে ৪০ মিনিট ডাল ভিজিয়ে রাখা এবং সঠিকভাবে প্রেসার কুকিং—এই দুটি অভ্যাসই ডালকে করে তুলতে পারে অনেক বেশি হজমযোগ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় রান্নাঘরে এই পদ্ধতি প্রচলিত থাকার পেছনেও রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক
এসআর
মন্তব্য করুন: