[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

এইচআইভির সংক্রমণ বাড়ছে বাংলাদেশে, চিকিৎসার আওতার বাইরে ২৬ শতাংশ

আবদুল হাই তুহিন

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬ ৮:৫৮ পিএম

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো তুলনামূলকভাবে কম।

বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো তুলনামূলকভাবে কম।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন সংক্রমণ, এইডস-সংক্রান্ত মৃত্যু এবং চিকিৎসার বাইরে থাকা রোগীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাতীয় পর্যায়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে।
একই সময়ে এইডস-সংক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে ২৫৪ জনের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এইচআইভির সামগ্রিক হার কম হলেও নতুন সংক্রমণের এই প্রবণতা উদ্বেগজনক।

বিশেষ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকা রোগী, সামাজিক stigma এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিরোধমূলক সেবার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এক বছরে নতুন আক্রান্ত ১,৮৯১:
জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (NASP) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১,৮৯১টি নতুন HIV সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
আগের ১২ মাসে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে ৪৫৩ জন বা প্রায় ৩২ শতাংশ।
২০২৫ সালের হিসাবটি দেশের HIV নজরদারি ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধিগুলোর একটি।
২০১০ সালে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৩৪৩; পরবর্তী বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

দেশে মোট শনাক্ত ১৪ হাজার ৩১৩ :
বাংলাদেশে প্রথম HIV সংক্রমণ শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ৩১৩টি HIV সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে ২ হাজার ৬৬৬ জন মারা গেছেন। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন বর্তমানে HIV নিয়ে বসবাস করছেন।

অর্থাৎ, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এবং সম্ভাব্য মোট আক্রান্তের সংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

গবেষণা ও জাতীয় কর্মসূচির তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্তদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো নিজেদের HIV status সম্পর্কে জানেন না।

৪১ জেলায় নেই HIV পরীক্ষার সুবিধা :
এইচআইভি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষার সীমিত সুযোগ।

এপ্রিল ২০২৬-এ আয়োজিত এক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪১ জেলায় HIV/AIDS পরীক্ষার সুবিধা নেই। অর্থাৎ মাত্র ২৩টি জেলায় পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার সুযোগ না থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।


ফলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের অজান্তেই দীর্ঘ সময় ভাইরাস বহন করতে পারেন এবং চিকিৎসার বাইরে থেকে যেতে পারেন।
চিকিৎসার বাইরে প্রায় ২৬ শতাংশ:
বাংলাদেশে HIV শনাক্ত হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় নেই।
এপ্রিল ২০২৬-এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, শনাক্ত রোগীদের প্রায় ২৬ শতাংশ এখনো চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের treatment cascade অনুযায়ী, আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন HIV আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ নিজেদের সংক্রমণ সম্পর্কে জানেন।
শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART) নিচ্ছেন। ART গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশের ভাইরাল suppression অর্জিত হয়েছে। তবে এই তিনটি ধাপই আন্তর্জাতিক 95-95-95 লক্ষ্যমাত্রার নিচে।


তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সীদের মধ্যে বেশি:


বাংলাদেশে HIV আক্রান্তদের বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের মানুষ।
জাতীয় তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ব্যক্তিরা মোট শনাক্ত রোগীর ৬৫ শতাংশের বেশি। পুরুষ ও নারীর অনুপাত প্রায় ২:১।
এ কারণে HIV শুধু একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, পরিবার ও অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে ঝুঁকি বেশি
সাধারণ জনগোষ্ঠীতে HIV-এর prevalence বাংলাদেশে এখনো ০.০১ শতাংশের নিচে।
তবে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ (MSM), যৌনকর্মী, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী এবং অভিবাসী শ্রমিক।

গবেষণা ও নজরদারি তথ্য বলছে, এসব জনগোষ্ঠীর কাছে নিয়মিত পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক সেবা ও চিকিৎসা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতেও শনাক্ত হচ্ছে সংক্রমণ:
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ২১৭ জন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন।
ফলে কক্সবাজারসহ সীমান্তবর্তী ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় HIV প্রতিরোধ কর্মসূচিকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকায় আক্রান্তের হার বেশি:


জাতীয় তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট শনাক্ত HIV রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে প্রায় ৩৫.৪৪ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ২৭.৫১ শতাংশ রয়েছে।

ফলে দেশের বড় শহর, সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং অভিবাসনপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ও পরীক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব পরিস্থিতিও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে :


বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বজুড়েও HIV প্রতিরোধ কার্যক্রম নতুন চাপের মুখে পড়েছে।
জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত UNAIDS-এর প্রাথমিক ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৯ লাখ মানুষ HIV নিয়ে বসবাস করছেন।

২০২৫ সালে নতুন সংক্রমণ হয়েছে আনুমানিক ১২ লাখ এবং AIDS-সংক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আনুমানিক ৭১ লাখ মানুষ HIV নিয়ে বসবাস করছেন, নতুন সংক্রমণ প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার এবং AIDS-সংক্রান্ত মৃত্যু প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার।
তবে জুন ২০২৬-এ UNAIDS সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় HIV প্রতিরোধ ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালে ৬২টি দেশে HIV প্রতিরোধে ব্যবহৃত PrEP গ্রহণকারীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কমে ৩৩ লাখ থেকে ২১ লাখে নেমেছে। একই সময়ে কিছু উচ্চ-সংক্রমণপ্রবণ দেশে HIV testing-ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।


বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা: 
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের HIV পরিস্থিতিকে এখনো ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ বলা যাবে না। কিন্তু নতুন সংক্রমণের দ্রুত বৃদ্ধি, ৪১ জেলায় পরীক্ষার সুবিধার অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসার বাইরে থাকা রোগীর সংখ্যা পরিস্থিতিকে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
HIV আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে ART-এর আওতায় আনা, পরীক্ষার সুযোগ জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য গোপনীয় ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক বৈষম্য কমানো—এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কারণ HIV এখন আর নিশ্চিত মৃত্যুর রোগ নয়। নিয়মিত ART গ্রহণ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। একই সঙ্গে চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে অন্যের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব।

এসআর

সম্পর্কিত খবর