‘এক বাক্স’ নীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক আসন বণ্টনের ঘোষণার পর ইসলামি আন্দোলনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে
—এই উদ্যোগকে কার্যত হাইজ্যাক করেছে জামায়াতে ইসলামী।
চূড়ান্ত ঘোষিত আসন বণ্টনে দেখা যায়, এনসিপিকে ৩০টি, মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলকে ২০টি, মজলিসের একটি শাখাকে ১০টি এবং অলি আহমদের দলকে ৭টি আসন দেওয়া হয়েছে। অথচ এসব দলের সারাদেশব্যাপী ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক বিস্তার ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে এনসিপির জাতীয় পর্যায়ে ভোট কত শতাংশ , মামুনুল হকের দলের সাংগঠনিক শক্তি কতটা বিস্তৃত, কিংবা অলি আহমদের দলের নাম ও প্রতীক সাধারণ ভোটারদের কতজন চেনেন—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভোটভিত্তিক বাস্তবতা ও মাঠপর্যায়ের শক্তিকে মানদণ্ড ধরা হতো, তাহলে এসব দলের তুলনায় ইসলামি আন্দোলনের আসন প্রাপ্যতা অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল।
ইসলামি আন্দোলনের অভিযোগ, যে কটি আসন তাদের জন্য বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, সেগুলোর একটিতেও তাদের শক্তিশালী বা সম্ভাবনাময় প্রার্থী নেই। বিপরীতে, যেসব আসনে ইসলামি আন্দোলনের জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো জামায়াতে ইসলামী নিজেদের দখলে রেখেছে অথবা সেখানে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
এছাড়া ৪৭টি আসন ‘উন্মুক্ত’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব আসনে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লা—উভয় প্রতীকের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের মতে, এর ফলে তাদের একক আসন সংখ্যা বাস্তবে ৩০-এর নিচে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই কৌশলের মাধ্যমে এনসিপিকে দ্বিতীয় বৃহৎ ইসলামপন্থী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামি আন্দোলনকে তৃতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইসলামি আন্দোলনের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, আসন বণ্টন নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই জামায়াত একাধিক দলকে সমঝোতায় যুক্ত করেছে। দিনের পর দিন বৈঠকের সময় নির্ধারণ করে তা বিনা নোটিসে বাতিল করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো ইসলামি আন্দোলনকে অন্ধকারে রেখে এককভাবে নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও জামায়াতের পক্ষ থেকে সেগুলোর কোনোটি সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার করা হয়নি। ফলে সমঝোতার স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—শুরু থেকেই ইসলামি আন্দোলনের নেতারা এই সমঝোতাকে ‘নির্বাচনী জোট’ না বলে ‘এক বাক্স’ নীতির ভিত্তিতে একটি নির্বাচনী উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছিলেন। সাংবাদিকরা জোট বললে তারা সংশোধন করতেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে কখনো এমন সংশোধন আসেনি।
বর্তমানে ‘এক বাক্স’ উদ্যোগের উদ্যোক্তা সৈয়দ রেজাউল করিমের ভূমিকা আড়াল করে ‘নির্বাচনী ঐক্য’ নামে নতুন পরিভাষা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ইসলামি আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এটি মূল ধারণা ও নেতৃত্বকে মুছে ফেলারই অংশ।
একক নির্বাচনের সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক সমীকরণ
জামায়াতের কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইসলামি আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এমন আলোচনাও জোরালো হচ্ছে।
তবে ইসলামি আন্দোলন আগেই ২৮৬টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। ফলে তারা এককভাবে নির্বাচনে গেলে বহু আসনে জামায়াতের পরাজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে ধর্মপ্রাণ ভোট ভাগ হলে ধানের শীষের বিপরীতে অন্তত শতাধিক আসনে জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে ব্যর্থ হতে পারে—এমন অনুমান করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অনেকের মতে, ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্মিলিত অবস্থান দেশীয় রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস, জামায়াতের একচেটিয়া সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত আধিপত্যের রাজনীতি সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে।
জামায়াতে ইসলামীর এই ভূমিকার ফলে শুধু ইসলামি আন্দোলন নয়—সমগ্র ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থানই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিজেদের রাজনৈতিক লাভের জন্য বৃহত্তর সম্ভাবনাকে বিসর্জন দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসআর
মন্তব্য করুন: