২০২৫ সাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) জন্য ছিল শোক আর বেদনার বছর।
বছরের পর বছর ধরে নয়, বরং মাত্র একটি বছরেই একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনা, আকস্মিক শারীরিক জটিলতা, আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ড—নানান কারণে অকালেই থেমে গেছে এসব তরুণের জীবনযাত্রা।
তাদের অনুপস্থিতি শুধু পরিবার নয়, পুরো ক্যাম্পাসকে করেছে শূন্য ও ভারাক্রান্ত।
বছরের শুরুতেই ২৬ জানুয়ারি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাবরিনা রহমান শাম্মীর আত্মহত্যার খবরে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে ক্যাম্পাস। যশোরের চৌগাছা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন তিনি।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিব রিয়াদ ইঁদুর মারার বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন। তার বাড়ি ছিল বগুড়া জেলায়।
মাত্র দুই দিন পর, ১৯ ফেব্রুয়ারি ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী আহাদ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। গলায় গামছা পেঁচিয়ে নেওয়া এই শিক্ষার্থীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।
১৮ মার্চ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান সীমান্ত কিডনি জটিলতায় মারা যান। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়।
বছরের শেষ ভাগে এসে মৃত্যুর মিছিল আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। ৩ অক্টোবর ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতা হাসিবুর রহমান একটি রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ভোলার বাসিন্দা ছিলেন।
এরপর ৮ অক্টোবর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়।
১৯ অক্টোবর পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জুবায়েদ ইসলাম টিউশন করাতে যাওয়ার পথে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়।
২৪ অক্টোবর হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মানজুরা আক্তার ও তার দশ বছর বয়সী কন্যা সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের শান্তিগঞ্জ এলাকায় একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২৬ অক্টোবর ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল কালাম রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেল প্রকল্পের একটি পিলার থেকে পড়ে যাওয়া বিয়ারিং প্যাডের আঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পরপর এসব মৃত্যুর ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাঝে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন বিভাগ ও ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সহপাঠীদের কণ্ঠে উঠে আসে শোক, ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন।
২০২৫ সাল তাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি বেদনাবহ অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই ঘটনাগুলো নতুন করে সামনে এনেছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি।
অকালেই নিভে যাওয়া এসব তরুণ প্রাণ ছিল জবির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো—নক্ষত্রগুলো ঝরে গেলেও তাদের স্মৃতি রয়ে যাবে সহপাঠীদের হৃদয়ে এবং ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথে।
এসআর
মন্তব্য করুন: