[email protected] বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

রাজনীতি কি বদলে যাচ্ছে?

মেসবাহ শিমুল

প্রকাশিত: ৩ মার্চ ২০২৬ ৮:০৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

পবিত্র মাহে রমাদান হলো ইসরায়েলীদের জন্য যুদ্ধের মাস।

গেলো কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে তারা মুসলমানদের সিয়াম-সাধনার এই মাসে হয় ফিলিস্তিনীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় না হয় অপর কোনো মুসলিম দেশে হামলে পড়ে।

এই রমজানও বাদ যায়নি। তারা ইরানে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে।

আমেরিকার শক্তি ও সমর্থন নিয়ে ইরানে ইসরায়েলের এই চাপানো যুদ্ধে ইতোমধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতি। যার প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও নিশ্চয়ই পড়বে।

তবে আপাতত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে। এই বাতাসে ভেসে আসছে পরিবর্তনের গন্ধ। এই গন্ধ নতুন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে যেই পরিবর্তন আমাদের তাড়া করে ফিরছে শনিবার রাজনীতিতে যেন তারই রিহার্সেল দেখা গেলো।


একই দিনে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হলো।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার যাত্রা শুরুর মাত্র কয়েকদিনের মাথায় বৃহত পরিসরের এই ইফতার মাহফিল তাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ইফতারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদানকে বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

এমন ঘটনা গেলো কয়েক দশক এই দেশে ঘটেনি। এমন সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে বিরোধী দলের কোনো অনুষ্ঠানে কোনো সরকার প্রধান গিয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে নেই।

ফলে তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক শিষ্টাচার যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটি নি:সন্দেহে বলা যায়।


রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এটি পরিবর্তনের শুরু। গতানুগতিক রাজনীতির ধারা থেকে বের হয়ে ভবিষ্যতমুখী রাজনীতি কেমন হবে এটি তার নমুনা।

জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পাশাপাশি বসার এই ছবি এখন সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ডিংয়ে। তাতে লাখ লাখ নেটিজেনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। আশাবাদের গল্প আর স্তুতি।


অপরদিকে এনসিপির ইফতারে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তকারী বক্তব্য দিয়েছেন। দলটি প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় দেশের গণতান্ত্রিক পথে উত্তোরণে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সনাতনী রাজনীতিতে এখন আর বিশ্বাস করি না।

আমরা ইতিহাসের দিকে কেবল যাই না আমরা ভূগোলের দিকেও যেতে চাই। আগের যামানায় দেখতাম বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, সাতচল্লিশ, একাত্তর দিয়ে শুরু করে বক্তব্য শেষ করতে করতে তার আর তেমন কিছু থাকে না বক্তব্যে। আমরা রাজনীতি করবো বর্তমানের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য।


ভবিষ্যত বিনির্মাণের এই রাজনীতিতে এনসিপির অংশগ্রহনকে তিনি গণতান্ত্রিক বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গণতন্ত্রের মাঠে শতফুল ফুটবে।

অনেক ফুল দেখেছি যারা শুধু রাজনৈতিক সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এনসিপি যেন সত্যিকারার্থে এদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। এদেশের জনমানুষের আকাঙ্খাকে ধারণ করে। চব্বিশের জুলাইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা এবং প্রত্যাশাকে তারা যেন ধারণ করে।

তিনি বলেছেন, রাজনীতি কোনো স্ট্যাটিক বিষয় নয় এটি একটি গতিশীল বিষয়। আমাদের সেই গতিশীলতা মেনে নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থে ঐক্যমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে জাতীয় সংসদ ছিলো বিন্দু, কেন্দ্র ছিলো গণভবনে।

আমরা সেই যায়গা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন সংসদে জাতির স্বার্থে বিতর্ক হবে। আলোচনা হবে। এভাবেই দেশকে এগিয়ে নিতে এনসিপি ভূমিকা রাখবে এমন জোরালো প্রত্যাশা রাখেন বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা।


এনসিপির ইফতারে সংক্ষিপ্ত এই বক্তব্য রেখে তিনিও যোগ দেন জামায়াতের ইফতার মাহফিলে। মূলত: শনিবারের জামায়াতের ওই ইফতার মাহফিল বিএনপির কাছেও বিশেষ আকর্ষণের ছিলো। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন মাইলফলক।


যত যাই বলা হোক বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের ভীত রচনা করেন মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তার দীর্ঘ দিনের রাজনীতিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সম্পর্কে গড়ায়।

বিশেষ করে কথিত যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের ফাঁসি কার্যকরের পর খালেদা জিয়া ওইসব নেতাদের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর রাখতেন।

রাজনীতির মাঠে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করার যে যুদ্ধ সেই যুদ্ধে বিএনপির বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে জামায়াত দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে গেছে।

আজ আওয়ামী লীগ মুক্ত দেশে বিএনপি-জামায়াত একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিযোগী হলেও প্রতিপক্ষ নয়। বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ধোঁয়াশা থাকলেও কেন্দ্রে সে বিষয়টি স্পস্ট। বিশেষ করে শনিবারের ইফতার মাহফিলের চিত্র তাই বলে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্খা ছিলো পুরণো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিদায়। সম্ভাবনার নতুন রাজনীতির সূচনা। বিশেষ করে তরুন প্রজন্ম রাজনীতির গুণগত এই পবিরর্তন দেখতে চায়। তারা হিংসা-প্রতিহিংসা কিংবা দোষারোপের রাজনীতি চায় না।

পূরণো ইস্যু নয় তাদের কাছে ভবিষ্যতমুখী উন্নয়ন নীতিই হলো রাজনীতি।
শনিবারের দুটি ইফতার মাহফিলে সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের ইফতারে যোগ দিয়ে পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেটিই যেন মুখে বলে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই দিনে এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য এদেশের জনগণ ঠিক কবে দেখেছে কিংবা আদৌ দেখেছে কি না তার নজির নেই।


আর ক’দিন পরই জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। সংসদে একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব কথা বলবে।

বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারে থাকবে বিএনপি। জামায়াত এবং এনসিপি বিরোধী দল হিসেবে সংসদে থাকবে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সেই কর্মযজ্ঞে আলোচনা-সমালোচনা হবে। যুক্তি-তর্ক, হৈ-হট্টোগোল হবে।

সরকারি দল জনগণের কল্যানে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত-এনসিপি তাতে সহযোগিতা করবে।

আর জনস্বার্থ বিরোধী হলে সেখানে থাকবে তুমুল প্রতিবাদ। কেবল অ্যাবসিলিউট মেজরিটির দোহাই দিয়ে বিএনপি তাদের পাশ কাটিয়ে যাবে না-এমন চিত্র যখন দেখবো কেবল তখনই বুঝবো ইফতার মাহফিলে বিএনপির অংশগ্রহণ ছিলো সত্যিকারার্থে পরিবর্তনে সূচনা।

যেই পরিবর্তনের জন্য চব্বিশে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা জীবন বিসর্জন দিয়েছে। হাসিমুখে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে হাজার হাজার বিপ্লবী।

লেখক: সাংবাদিক ও কথাশিল্পী।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর