ব্যাংকক থেকে: বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘস্থায়ী এ চাপ মোকাবিলায় শুধু এ পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, এসব সমস্যার সমাধানে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পরিবর্তে সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি।
সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারও বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনতে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি জরুরি।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, এ খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং খাতটির ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও আইএমএফের উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশে নেমেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত কম।
আইএমএফের মতে, উন্নয়ন ব্যয় মেটানো, সরকারি সেবার অর্থায়ন এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, কর আহরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজস্ব আয় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের জন্যও বাড়তি সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় ঋণের পরবর্তী কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সংস্থাটির কাছে নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়।
এর ধারাবাহিকতায় গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সফরে অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এসব আলোচনায় উঠে আসা সংস্কার প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে আইএমএফের চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশেরও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে বলে জানান সংস্থাটির এই কর্মকর্তা।
তিনি আরও জানান, জুলাইয়ের সফরের পর থেকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত সংস্থাটি।
অর্থনীতিবিদদের কাছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কার এখন বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে এসব ক্ষেত্রে সংস্কারের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এসআর