নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও মোবাইলসহ বেশির ভাগ ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ এবং সশস্ত্র বাহিনীর নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত গেজেট তৈরির কাজ করছে। গেজেট প্রকাশ হলে নতুন কাঠামোর বিস্তারিত বিষয় জানা যাবে। নতুন কাঠামোয় আগের মতো ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হচ্ছে।
নতুন কাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতনের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৭.৮। বর্তমানে এ অনুপাত ১:৯.০৭৬। ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পান। নতুন প্রস্তাবে এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। তবে মূল বেতন বাড়ায় শতাংশ কমলেও প্রকৃত টাকার পরিমাণ বাড়বে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলায় বর্তমানে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় তা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে নামবে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে কর্মরতদের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এই হার হবে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ।
বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিজীবীদের জন্য মাসে ৩ হাজার এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনাররা মাসে ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা পাবেন। বর্তমানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনারদের চিকিৎসা ভাতা ২ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১৫০ টাকা করে পাবেন।
বর্তমানে প্রথম থেকে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকা পান।
জীবনযাত্রা ও পরিবহন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতা আগের মতো মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে।
পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং সদর এলাকার বাইরে ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। হাওর, দ্বীপ ও চর ভাতাও মূল বেতনের ২০ শতাংশ বহাল রেখে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা প্রতিবছর মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে এ হার আলাদা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকবে। তবে পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামোর প্রস্তাব রয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমমর্যাদার পদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে।
পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে ১০ বছর থাকার বর্তমান শর্ত কমিয়ে আট বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জন্য একই গ্রেডে ছয় বছর থাকার শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে।
পদোন্নতিযোগ্য পদে থাকা কর্মীরা এভাবে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডে যেতে পারবেন। আর যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ব্লকড পদ হিসেবে বিবেচিত, সেসব পদের চাকরিজীবীরা পুরো চাকরিজীবনে তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন চলতি বছরের জুলাই, আগামী ডিসেম্বর এবং পরবর্তী জুলাই—এই তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।
অর্থাৎ নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও মূল বেতন একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি, ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
বর্তমান কাঠামোয় চলতি অর্থবছরে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্ট বাবদ সরকারের ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে এ ব্যয় বেড়ে চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা হবে।
আগামী অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়াবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। আর ২০২৮ সালে সব ভাতা কার্যকর হলে মোট ব্যয় বেড়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
এসআর