বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার পাশাপাশি বিরোধী দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
সারজিস আলম বলেন, বর্তমান বিএনপি আর বেগম খালেদা জিয়া কিংবা প্রয়াত মেজর জিয়াউর রহমানের সময়ের বিএনপি নেই।
একইভাবে ২০২৪ সালের আগে অনলাইনে জনগণের পক্ষে সরব থাকা তারেক রহমানও এখন আগের অবস্থানে নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্য, বর্তমান তারেক রহমানের সামনে এখন ক্ষমতা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার পর কীভাবে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করা যায় এবং রাজনৈতিক পরিসরের সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়, সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সারজিস বলেন, সংসদ থেকে রাজপথ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের ‘প্রতারণার রাজনীতি’ করা হচ্ছে, এর পরিণতি একসময় বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে।
বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে জাতীয় পার্টিকে পোষ্য বিরোধী দল হিসেবে দেখা গেলেও ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিএনপি এমন কোনো বিরোধী দল পাবে না।
এনসিপি বিএনপির নির্দেশনা বা রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী সংসদ কিংবা রাজপথে ভূমিকা পালন করবে না বলেও জানান তিনি।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সারজিস আলম দাবি করেন, নির্বাচনের আগে এনসিপির প্রার্থীদের যদি একটি নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থাকত, তাহলে দলটি আরও অন্তত পাঁচটি আসনে জয় পেতে পারত।
তিনি বলেন, অল্প ভোটের ব্যবধানে যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত নির্বাচনী অভিজ্ঞতার অভাবে কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়েছেন। তার মতে, তারা ভোটের মাঠে সরাসরি পরাজিত না হয়ে প্রতিপক্ষের কৌশল ও অপকৌশলের কারণে হেরেছেন।
আগামী দিনের সাংগঠনিক পরিকল্পনা তুলে ধরে সারজিস বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে এনসিপির ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের লক্ষ্য রয়েছে।
দলকে তৃণমূল থেকে শক্তিশালী করা গেলে ২০৩১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে এনসিপি সরকার গঠন করে সংসদে যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, শাহবাগের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির সরাসরি ভূমিকা না থাকায় দলটির নেতারা শাহবাগের আন্দোলনের বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, শাহবাগের আন্দোলনের সময় যারা রাজপথে ছিলেন না, তারা এখন সেই আন্দোলনের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তার মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছিল।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করে সারজিস বলেন, বিদেশের কোনো শহর থেকে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। এর ফলেই অনেক রাজনৈতিক নেতা দেশে ফিরে এসে সংসদে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
শাহবাগ ও পল্টনের আন্দোলনকে অবজ্ঞা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা সেই আন্দোলনে ছিলেন না, তাদের মধ্যে ওই আন্দোলন নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতা কাজ করতে পারে।
সারজিস আরও বলেন, কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা বা ভয় দেখানো দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা সম্ভব হলেও, স্বৈরাচারী শাসনের পথে কেউ হাঁটলে তার পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে।
দলের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়িয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, দলের ভেতরের কোনো বিষয়ে যেন নেতাকর্মীদের শক্তি ও সময় অপচয় না হয়।
এনসিপির সামনে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই রয়েছে উল্লেখ করে তিনি যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নেতৃত্বে আসার সুযোগ দেওয়ার কথা জানান।
সারজিস বলেন, বর্তমানে কেউ জেলা কমিটির সদস্য থাকলেও সাংগঠনিক কাজে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে ভবিষ্যতে ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছরের মধ্যে জেলার নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সভায় কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিন সভাপতিত্ব করেন। কেন্দ্রীয় সদস্য ইমরান হোসাইন তুহিন সভা সঞ্চালনা করেন।
এ সময় বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার, যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং নোয়াখালী পৌরসভায় এনসিপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাজী মাঈন উদ্দিন তানভীর।
এ ছাড়া সভায় নোয়াখালী জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এসআর