রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তার চারজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সিদ্দিক আজাদ তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। শাহ আলী থানার প্রসিকিউশন সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এর আগে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চার আসামিকে কারাগারে রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলী থানার উপপরিদর্শক মো. আতোয়ার রহমান।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে একদল ব্যক্তি হ্যামার, লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা দেয়াল টপকে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দায়িত্বে থাকা দুই নৈশপ্রহরী আন্দ্রিয় সরকার (৪৩) ও মো. আব্দুল হাইকে (৬৩) মারধর করে এবং পরে তাদের বেঁধে রাখে।
হামলাকারীরা হ্যামার দিয়ে প্রধান ফটক ভেঙে একটি ভেকু মেশিন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নেয়। এরপর পূর্ব পাশের প্রায় ২৮ ফুট বাই ১৫ ফুট আয়তনের একটি সেমিপাকা স্থাপনা ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে আনুমানিক ৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা সেবার একটি সেমিপাকা ঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য। ক্লিনিক ইনচার্জ, চিকিৎসক ও ডেপুটি ক্লিনিক ইনচার্জের ব্যবহৃত আরেকটি সেমিপাকা ভবন এবং সেখানে থাকা আসবাব ও যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অংশে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টাকা বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।
রেজিস্ট্রেশন শাখাতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ ও ৪০ ফুট প্রস্থের ওই স্থাপনায় আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালাও ভাঙচুর করা হয়। এতে আরও প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা ক্লিনিক থেকে বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রীর পাশাপাশি দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, দুটি প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি এবং তিনটি স্টিলের আলমারি নিয়ে যায়। এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে সব মিলিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চলে যাওয়ার সময় হামলাকারীরা নৈশপ্রহরীদের ভয়ভীতি দেখায় এবং সেখানে একটি দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানার ও সাইনবোর্ড টাঙিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় মো. হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ দশক ধরে সরকার থেকে চুক্তির ভিত্তিতে পাওয়া জমিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ইপিআই টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পূর্বশত্রুতার জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন মাথায় লাল কাপড় ও মুখোশ পরে দেশীয় অস্ত্র হাতে প্রতিষ্ঠানে ঢোকে। নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রাখার পর তারা বিভিন্ন কক্ষ ও স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার সময় সরকারি ইপিআই টিকার সামগ্রী, টিকাদানের রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্টিলের আলমারি ও ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম ও রিএজেন্ট, টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও প্রিন্টার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ দাবি করছে। অর্থের বিনিময়ে হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়েও তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা শাহ আলী থানার এলাকার বাসিন্দা না হওয়ায় তাদের দেওয়া নাম-ঠিকানা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে আদালতকে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা জামিনে বের হলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আত্মগোপনে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়।
এদিকে পুলিশ জানায়, সিডিএমএস ও থানার রেকর্ড পর্যালোচনা করে মো. জুয়েলের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের একটি মাদক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এসআর