পাউরুটি ও বেকারি পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কেন নেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে পাউরুটির প্যাকেটে ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার করা হয়নি’—এমন ঘোষণা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
রুলে খাদ্য সচিব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ অটো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী জাহিদ তালুকদার।
আদালতের আদেশের পর আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল জানান, পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে আদালত রুল দিয়েছেন। বাজারজাত করা পাউরুটির প্যাকেটে ওই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি—এমন তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও আদালত সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
যে কারণে রিট
গত ১৮ জুলাই একটি দৈনিকে পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে ২৬ জুলাই মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্নেন্স ফাউন্ডেশন জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিটটি করে।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান কবীর আলমগীরের করা আবেদনে পাউরুটি উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। পাশাপাশি প্যাকেটজাত পাউরুটিতে উপাদানগুলোর তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ এবং পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার না করার ঘোষণা দেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা চাওয়া হয়।
রিটকারীর বক্তব্য, বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পটাশিয়াম ব্রোমেট খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রিটকারীর দাবি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও ২০২২ সালে খাদ্যপণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এরপরও কিছু ক্ষেত্রে এই রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
কবীর আলমগীর বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়—এমন কোনো উপাদান খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
পরীক্ষায় মিলেছিল মাত্রাতিরিক্ত ব্রোমেট
রিটে ২০২১ সালের পরীক্ষার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। ওই সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ১৯টি পাউরুটির নমুনার মধ্যে ১৬টিতে মাত্রাতিরিক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেট পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব নমুনায় রাসায়নিকটির পরিমাণ ৩ দশমিক ৩১ থেকে ১২ দশমিক ৯১ পিপিএম পর্যন্ত ছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরীক্ষার ফলাফলের পর পাউরুটি, রুটি ও বিভিন্ন বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেটের ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা জারি করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে এসব উপাদানযুক্ত খাদ্য উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানিয়েছিল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আগের নির্দেশনায় পটাশিয়াম ব্রোমেটকে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে এটি বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, জেনেটিক ক্ষতি এবং ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও রাসায়নিকটির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডায়রিয়া, বমিভাব ও পেটের সমস্যাসহ নানা শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের নমুনাতেও উপস্থিতির তথ্য
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংগ্রহ করা কিছু খাদ্য নমুনাতেও পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ও তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কয়েকটি নমুনায় ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেটের উপস্থিতিও পাওয়া যায়। নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় এর পরিমাণ বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে।
পাউরুটিতে ব্যবহারের ইতিহাস
পাউরুটির মান নির্ধারণে ২০১৬ সালে বিএসটিআইয়ের একটি মানদণ্ডে কয়েক ধরনের উপাদান ব্যবহারের অনুমোদন ছিল। এর মধ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেটও ছিল। ওই সময় প্রতি কেজি পাউরুটিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের অনুমতি ছিল।
পরবর্তীতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আন্তর্জাতিকভাবে এর ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৮ সালে পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিএসটিআই।
বেকারি শিল্পে পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে এর কম খরচে ময়দার খামিরকে ভালোভাবে ফুলিয়ে তোলা এবং পাউরুটিকে আকর্ষণীয় আকৃতি দেওয়ার সক্ষমতার কথা বলা হয়। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
এসআর